সোহেল-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যুদণ্ড

অলিউল ইসলাম ও মোহাম্মদ গাফফার হোসেন

আইন-আদালত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামি সোহেল রানা তার স্ত্রী স্বপ্না

2026-06-08T01:40:27+00:00
2026-06-08T01:41:45+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আইন-আদালত
সোহেল-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যুদণ্ড
অলিউল ইসলাম ও মোহাম্মদ গাফফার হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ১:৪০ এএম  আপডেট: ০৮.০৬.২০২৬ ১:৪১ এএম  (ভিজিট : ১০)
ছবি : সময়ের আলো
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামি সোহেল রানা তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। 

রোববার (৭ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দণ্ডের পাশাপাশি আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। 

এ টাকা ভিকটিমের আইনগত উত্তরাধিকারী পাবে। ক্ষতিপূরণ না দিলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ভিকটিমের আইনগত উত্তরাধিকারীকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গতকাল বেলা ১১টায় বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে আসেন। এরপর তিনি এ মামলার রায় পড়া শুরু করেন। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা করেন।

আদালত রায়ের পর্যালোচনায় জানান, এ মামলায় চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও তথ্যে প্রমাণিত হয় যে ওই শিশুকে ধর্ষণ ও তার পরে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পুলিশের সাক্ষ্যেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ১ নম্বর থেকে ১৬ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে উঠে আসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর আসামি সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। এ সময় আরেক আসামি স্বপ্না আক্তার ওই ফ্ল্যাটেই ছিল। হত্যা ও ধর্ষণকাজে বাধা না দিয়ে সে অপরাধে সহযোগিতা করে।  

ফলে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার একই অপরাধে অপরাধী। রায় পর্যালোচনায় আদালত আরও বলেছেন, সব সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এটি প্রমাণিত যে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে আসামি সোহেল রানা ওই শিশুকে ধর্ষণ করে এবং হত্যা করে। আদালত আসামি সোহেল রানার জবানবন্দিও উল্লেখ করে। জবানবন্দিতে সে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে।

প্রতিক্রিয়া : দ্রুত সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ জানানোর পাশাপাশি রায় দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশা করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ, আসামি পক্ষ, ভুক্তভোগী পরিবার, সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে শুরু করে আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, এ ধরনের মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রতিরোধে শক্ত বার্তা যাবে সমাজে।

রায় ঘোষণার পর আসামি পক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়েই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু এ রায়কে শিশু নির্যাতন দমনে একটি মাইলফলক বলে অভিহিত করেন। 

তিনি বলেন, অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে মাত্র চার কার্যদিবসে সম্পন্ন হওয়া এই বিচার একটি নজির হয়ে থাকবে। শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে তিনি জানান, পরবর্তী কার্যক্রম আইন অনুযায়ী হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে চলবে, কোনো প্রক্রিয়া বাইপাস করা যাবে না।

আসামি পক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, সোহেল রানা দোষ স্বীকার করায় অপরাধীরা যথাযথ বিচার পেয়েছে। তিনি সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

রায়ের পর ধর্ষণ ও হত্যার শিকার রামিসার বাবা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়ের মধ্যে আমরা কাক্সিক্ষত রায় পেয়েছি। তিনি দ্রুত রায় কার্যকরের আশা প্রকাশ করেন। শিশুটির বাবা আরও বলেন, ‘আমি আলহামদুলিল্লাহ ১০০ শতাংশ খুশি।’ তিনি বলেন, মেয়ের হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর দেখতে চান। একই সঙ্গে বিচারক, পুলিশ প্রশাসন, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

উচ্চ আদালতেও রায় বহাল থাকার আশা আইনমন্ত্রীর : দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। 

রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করে মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে এই বেদনাদায়ক ঘটনার বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে বিরল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে।

দ্রুত সময়ে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ-হত্যা মামলার রায় হওয়ায় জনপ্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। 

তিনি বলেন, পুলিশের তৎপরতা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এভাবেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সরকার কাজ করছে।

আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ : শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করায় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। 

রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কার্য উপদেষ্টা কমিটির সভায় তিনি বলেন, একটি নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনার দ্রুত তদন্ত, আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতারের মাধ্যমে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে। 

তিনি আশা প্রকাশ করেন, মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং দোষীরা আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবে।

রামিসা হত্যার রায় বিচারিক প্রক্রিয়ার মাইলফলক- অ্যাটর্নি জেনারেল : রামিসা হত্যা মামলার রায়কে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি মাইলফলক বলেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। রোববার তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন যাত্রা।

রায় দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা : ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খান বলেন, শিশুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনায় দেশ আতঙ্কিত। তিনি বলেন, রায় দ্রুত বাস্তবায়িত হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং অপরাধ কমবে।

রায় শুনতে আদালতে শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীরা : আলোচিত এই মামলার রায় শুনতে পুরান ঢাকার আদালতে উপস্থিত হন ঢাকা সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা নৃশংস ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া সরাসরি দেখতে আদালতে আসেন।

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথিলা ভূঁইয়া হীরা মনি বলেন, তার ছোট বোনও রামিসার বয়সি। তিনি দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই কলেজের শাকিবুল হাসান বলেন, ধর্ষণের পেছনে বিকৃত মানসিকতা কাজ করে। তার সহপাঠী সুরাইয়া তাসনিম বলেন, ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করা ভুল। 

তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেন। মানবাধিকারকর্মী গুলশানারা নিপা বলেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হওয়া জরুরি, যেন ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন না হয়।

রায় ঘোষণার সময় যেমন ছিল আসামিরা : রায় ঘোষণার দিন সকালে আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয়। পরে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে প্রিজন ভ্যানে করে আনা হয়। আদালতে রায় পাঠ চলাকালে সোহেল দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এবং স্বপ্না একটি টুলে বসে ছিল। রায় ঘোষণার সময় সোহেলকে কাঁদতে দেখা যায় এবং স্বপ্না অশ্রুসজল ছিল। রায়ের পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতি : রায় ঘিরে আদালত এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ শতাধিক সদস্য আদালত এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন।

এর আগে ৪ জুন রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। আসামি পক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ আসামিদের পক্ষে সর্বনিম্ন শাস্তির আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক রায়ের দিন ধার্য করেন।

এর আগে ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। ২ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং ১৬ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। ১ জুন আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

উল্লেখ্য, গত ১৯ মে মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

/এসএকে


  বিষয়:   সোহেল  স্বপ্না  দম্পতি  মৃত্যুদণ্ড  রামিসা  আইন  আদালত 


Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: