দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা

এমএকে জিলানী

জাতীয়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের পর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের

2026-06-08T02:17:20+00:00
2026-06-08T02:17:20+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
জাতীয়
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ২:১৭ এএম   (ভিজিট : ১৭)
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে মানবেতর অবস্থায় রোজিনার পরিবার। ছবি : সময়ের আলো
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের পর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর এই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যেই যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গেছে। 

কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সীমান্তে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশে পুশইন নিয়ে যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আবারও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) জানিয়েছে, গত ৪ থেকে ৬ জুন এই তিন দিনে অন্তত ১৮টি পুশইন প্রচেষ্টায় ভারতের বিএসএফ প্রায় ২০০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে।

অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে সোমবার থেকে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনী বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে পুশইনের বিষয়টি সমাধানের জন্য জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তে আমাদের বর্ডার গার্ড সতর্ক আছে। সব অবৈধ পুশইনের চেষ্টাকে আমরা বাধা দেব। 

এই বৈঠকে (দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক) সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশইনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হবে। সেখানে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছি এবং আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। সরকার সব ধরনের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে এসব সমস্যা প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।

ভারতের পুশইন ইস্যুতে দেশটির মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল গণমাধ্যমে বলেন, ভারতে যদি বাংলাদেশিসহ কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে থাকে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেশে আইন রয়েছে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব মানুষকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা চালু আছে। 

সে অনুযায়ী প্রথমে মামলাগুলো বাংলাদেশি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়, যেন তারা ওই ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে। যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। অবৈধভাবে ভারতে থাকা ২ হাজার ৬৮০ বাংলাদেশির তালিকা পাঠানো হয়েছে ঢাকাকে। ৫ বছরেও নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই করে ফিরতি কোনো উত্তর দেয়নি বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের কাছে কোনো তালিকা আছে- এই মুহূর্তে আমার তা জানা নেই। যদি তালিকা থাকে তা হলে নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট উইং সেটা দেখছে। কিন্তু তালিকা থাকলে সেটা অবশ্যই আমরা যাচাই-বাছাই করব। সেই তালিকা বিজিবির হাতেও থাকার কথা। কোনোভাবেই আমরা পুশইন মেনে নেব না।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সীমান্তে বর্তমান পুশইনের ঘটনা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এর সঙ্গে চলমান ভূরাজনীতি এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িত। যার মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত ভোটের প্রভাব বেশি। 

বাংলাদেশে ভারতের পুশইন ইস্যুতে দিল্লির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সর্বদা তৎপর। আবার এই মুহুর্তে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার নেই। চলতি মাসের শেষের দিকে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন। বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির বদল ঘটতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশে ভারতের পুশইন নতুন না। এমন ঘটনার অনেক ইতিহাস আছে। কিন্তু পুশইনের নামে ভারত যা করছে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। যাদের পুশইন করা হচ্ছে তারা যদি বাংলাদেশের হয় তবে তা নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট ডকুমেন্টের ভিত্তিতে হবে; কিন্তু ভারত অসহায় মানুষদের সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে কেন? যা পুরোটাই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। 

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন বক্তব্য দেন তখন আমি সেটা শুনেছি। নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য শুনেই আমি তাদের ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়েছিলাম। যা এখন পুশইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ইস্যু দ্বিপক্ষীয়ভাবে কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ ভারতের জন্য বড় একটা বাজার। কিন্তু দেশটির নেতৃত্ব তা অনুধাবন করতে না পেরে নিজেরাই নিজেদের বাজার ধ্বংস করছে। অথচ ভারতের জনগণ কিন্তু এমন না, ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশিদের প্রতি আলাদা অনূভূতি রয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তিন মাসের ওপর সময় পার করে ফেলেছে। এর মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করতে সরকার অসম্ভব ঢিলেমি দিচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাটা সরকারের প্রায়োরিটিতে থাকা উচিত ছিল এবং সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। 

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এ ক্ষেত্রে সরকার নিষ্পৃহ ভাব দেখাচ্ছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এবং সম্প্রতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে ভারত সরকারের অবস্থান ভারতের ঊষ্ণতা প্রকাশ করে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ কোনো ধরনের সক্রিয় উদ্যোগ নেয়নি। বরং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে লিখিতভাবে যোগাযোগ করে সম্পর্কের সমতল নষ্ট করেছে। 

পুশইন পদক্ষেপ নিজে কোনো সমস্যা না, বরং তা বড় টানাপোড়েনের প্রতিফলন মাত্র। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন না কাটলে পুশইনের মতো ইরিট্যান্ট বাড়বে। এবং ভারতের সঙ্গে যেকোনো রকম সমঝোতা উদ্যোগে, অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে, বাংলাদেশকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলবে। সমাধানের উপায় একটাই। অচিরেই সামগ্রিক সম্পর্ক উন্নয়নের সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া। ডিসপুটেড বিষয় বর্তমানে সামনে না আনা। পাশাপাশি কথিত অবৈধ অধিবাসী সংক্রান্ত ভারতের অভিযোগ আমলে নিয়ে পরিষ্কার ভাষায় তার উত্তর দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিতে হবে। পুশইন নিয়ে বিজিবির শক্ত অবস্থান নির্মোহভাবে বহাল রাখতে হবে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুন ঝিনাইদহ, যশোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট ও নেত্রকোনা সীমান্তে মোট ১০টি পৃথক পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় বিএসএফ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় লোকজন জড়ো করলেও বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে পারেনি। পরদিন ৫ জুন লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় বলে জানায় বিজিবি। 

তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। লালমনিরহাট সীমান্তে চারটি পয়েন্ট দিয়ে ৩০ থেকে ৩৩ জনকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। পঞ্চগড়ের বড়বাড়ী সীমান্তে ১০ জনকে শূন্যরেখায় রাখা হয়। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করলেও বিজিবি এ দাবির পক্ষে প্রমাণ চেয়েছে। 

নওগাঁর সাপাহার সীমান্তেও ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। বিজিবির বাধার কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে কয়েক দিন ধরে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ডে’ অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন। 

এ সময় খাদ্যসংকট, বৃষ্টিতে দুর্ভোগ ও অসুস্থতার খবর পাওয়া যায়। পতাকা বৈঠকে বিএসএফ পুশইনের বিষয়টি স্বীকার করলেও এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। তবে ৬ জুন ভোরের দিকে ওই সীমান্তে অবস্থানরত নারী-শিশুসহ প্রায় ৪৫ জনকে আর দেখা যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, বিজিবির কঠোর নজরদারির মুখে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে সরিয়ে নিতে পারে।

অন্যদিকে গত ৬ জুন বিজিবি জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ঝিনাইদহ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নেত্রকোনা সীমান্তে আরও ৮টি পৃথক পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৬০ জনেরও বেশি মানুষ জড়িত ছিলেন। 

সব মিলিয়ে গত ৪ থেকে ৬ জুন এই তিন দিনে অন্তত ১৮টি পুশইন প্রচেষ্টায় প্রায় ২০০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও নেত্রকোনাসহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি সীমান্ত এলাকা বর্তমানে এই ইস্যুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

/এসএকে


  বিষয়:   দ্বিপক্ষীয়  নেতিবাচক  বার্তা  বিজিবি  বিএসএফ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: