সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, খুবই অল্প বয়সী একটি মেয়ের কোলে সাত মাস বয়সী একটি শিশু। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই অবাক হন। পরে জানা যায়, মেয়েটির বর্তমান বয়স ১৩ বছর ৪ মাস ২৩ দিন এবং তার কোলে থাকা সাত মাস বয়সী শিশুটি তার নিজের সন্তান। শিশুটির বাবা হিসেবে যার নাম এসেছে, তার বয়স ২২ বছর।
এই ঘটনা সামনে আসার পর প্রশ্ন ওঠে— এত কম বয়সে একটি মেয়ে কীভাবে সন্তানের মা হলো? এছাড়া, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা বিয়ে আইনগতভাবে বৈধ কি না এবং বাংলাদেশের আইন এ বিষয়ে কী বলে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
কীভাবে ঘটনার শুরু?
ঘটনার সময় কিশোরীটি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা জুয়েল খান একজন চালক। আর মা সৌদি আরবে কর্মরত থাকায় সে সময় দেশে ছিলেন না।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টিকটকের মাধ্যমে কিশোরীর সঙ্গে ২২ বছর বয়সী মো. শাকিল মিয়ার পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে থাকে।
কিশোরীর বাবা দাবি করেন, প্রথমে তার মেয়েকে সাত দিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে মেয়েটি বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার তাকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রায় ১১ থেকে ১২ দিন বাইরে রাখা হয়।
এ সময় শাকিল মিয়ার পক্ষ থেকে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে একটি এফিডেভিট করে বিয়ের দাবি করা হয়। তবে মেয়েটির বাবা শুরু থেকেই এই বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য, কোনো কাজীর মাধ্যমে কাবিন হয়নি এবং আইন অনুযায়ীও এই বিয়ের স্বীকৃতি নেই।
কীভাবে সন্তানের জন্ম হয়?
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, পরে কিশোরী গর্ভবতী হয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেয়। সে সময় কিশোরীর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর ৪ মাস।
এর কিছুদিন পর অভিযোগ ওঠে, শাকিল মিয়ার পরিবার শিশুটিকে নিজেদের কাছে রেখে কিশোরীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফলে নিজের সন্তানকে ছাড়াই তাকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়।
সন্তানকে ফিরে পাওয়ার লড়াই
নিজের সন্তানকে ফেরত পাওয়ার জন্য গত ২০ মে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করেন কিশোরী।
আবেদনের পর লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খানের নির্দেশে গত ১৬ জুলাই উভয় পক্ষকে হাজির হতে বলা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয় এবং এই সপ্তাহের মঙ্গলবার লিগ্যাল এইড অফিসের নির্দেশে শিশুটিকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে বিষয়টির এখানেই শেষ হয়নি। শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব কার কাছে থাকবে, সে বিষয়ে আগামী মঙ্গলবার আবারও ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য কী?
অভিযুক্ত মো. শাকিল মিয়া সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার দাবি, মেয়েটি তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, মেয়েটির পরিবার নাকি অন্য জায়গায় তার বিয়ে ঠিক করেছিল। সেই কারণেই মেয়েটি তাকে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিল।
শাকিল মিয়ার আরও দাবি, বিয়ের আগে মেয়েটির বাবার কাছ থেকে যে জন্মনিবন্ধনের কপি তিনি পেয়েছিলেন, সেখানে মেয়েটির বয়স ২০ বছর লেখা ছিল। একই বয়স কাবিননামাতেও উল্লেখ ছিল বলে তিনি দাবি করেন। পরে আদালতে গিয়ে তিনি প্রথম জানতে পারেন, অন্য একটি নথিতে মেয়েটির বয়স ১৩ বছর দেখানো হয়েছে।
এছাড়া তিনি দাবি করেন, তিন মাস আগে কিশোরী বাবার অসুস্থতার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় এবং সন্তানকে তাদের কাছেই রেখে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় শিশুটির কোনো খোঁজ নেয়নি বলেও তার অভিযোগ।
শাকিল মিয়া শিশুটির অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতেও একটি মামলা করেছেন।
আইনজীবীর বক্তব্য
কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র বলেন, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে যে বিয়ের কথা বলা হয়েছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
তিনি জানান, বাংলাদেশের আইনে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর কম বয়সে বিয়ে হলে সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হবে এবং আইনগতভাবে বৈধ হবে না।
আইনজীবীর মতে, এই ঘটনার ভিত্তিতে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে।
নতুন আইনে কী বলা হয়েছে?
২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এ ধরনের মামলার বিচার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড— উভয় ধরনের সাজার বিধান রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এই ধরনের মামলায় আপসের সুযোগও নেই।
নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে কি বৈধ?
আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ে করার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই।
তাদের মতে, মুসলিমদের ক্ষেত্রে কেবল নিবন্ধিত কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে সম্পন্ন ও নিবন্ধিত বিয়েই আইনত বৈধ। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও নিজ নিজ ধর্মীয় আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়।
তারা আরও বলেন, নোটারি এফিডেভিটের মাধ্যমে করা তথাকথিত বিয়ের ভিত্তিতে দেনমোহর, খোরপোষ বা উত্তরাধিকারসহ কোনো আইনি অধিকার দাবি করা যায় না। এছাড়া বয়স গোপন করে বাল্যবিবাহের জন্য এ ধরনের এফিডেভিট ব্যবহার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি তার মায়ের কাছেই রয়েছে। তবে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব কার কাছে থাকবে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মামলার চূড়ান্ত ফল কী হবে— এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত ও কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ