২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাত থেকে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকারও বেশি লোপাট হয়েছে। মূলত ব্যাংকিং খাতে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও সুসাশনের অভাবেই এমনটা সম্ভব হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধে এ তথ্য উঠে আসে।
দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট, ঋণখেলাপি, সুশাসনের ঘাটতি এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নীতিনির্ধারক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে ব্যাংক খাত ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সুশাসন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ। এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি এবং এর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ব্যাংক দখলকারীরাই শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে থাকে। তাই ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি শেয়ারবাজারকেও শক্তিশালী ও কার্যকর পুঁজির উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণের চিত্র বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কারা প্রকৃত উদ্যোক্তা এবং কারা প্রতারক। দেশের অধিকাংশ উদ্যোক্তা দায়িত্বশীল হলেও একটি অংশ নানা অনিয়ম ও অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত। শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং অর্থনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এ জন্য শেয়ারবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক সাংবাদিকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণ যতটুকু জানতে পেরেছে, তার বড় অংশই গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছে। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় গণমাধ্যম একটি অপরিহার্য উপাদান, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা থাকতে হবে, তবে সেই স্বাধীনতার ভিত্তি হতে হবে বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। গণমাধ্যমের জবাবদিহিতার একমাত্র মানদণ্ড হলো বস্তুনিষ্ঠতা। যে যতবেশি বস্তুনিষ্ঠ, সে ততবেশি কর্তৃত্বের সঙ্গে কথা বলার অধিকার রাখে।
তথ্যমন্ত্রী পরিসংখ্যান ও তথ্যের বিকৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তথ্য-উপাত্ত বিকৃত করা হলে বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো রাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট ফলাফল দেখানোর জন্য তথ্য ও পরিসংখ্যানকে ব্যবহার করে, তা হলে তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তথ্য ও পরিসংখ্যানকে ইচ্ছেমতো পরিবর্তনের সংস্কৃতি একটি অশনিসংকেত।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের ঘটনা কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির কারণে ঘটেনি; এগুলো মানুষের মাধ্যমেই ঘটেছে। তাই সমস্যাকে ব্যক্তি নয়, সামগ্রিক ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। সিস্টেমের মধ্যে দুর্বলতা থাকলে যে কেউ সুযোগ পেলে তথ্য বদলাতে, পরিসংখ্যান পরিবর্তন করতে কিংবা বাস্তবতা আড়াল করতে সক্ষম হবে।
ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং কমিশনের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া ব্যাংক খাতে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার বলেন, সুশাসনের ঘাটতির কারণেই দেশের ব্যাংক খাত আজ ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। ব্যাংক খাতে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতার চারটি ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক আগেই করপোরেট গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছিল। সেখানে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ব্যাংক খাতে নানা সংকট তৈরি হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর বলেন, ব্যাংকের অধিকাংশ অর্থই আমানতকারীদের। তারা আস্থার ভিত্তিতে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন। কিন্তু অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ বা ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা তারল্য সংকট সৃষ্টি করে। তখন আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ তুলতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়ার সময়ই কিছু গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের ইচ্ছা থাকে না। তাই ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে সতর্কতা এবং ঋণের অর্থ যথাযথ খাতে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে নুরুন নাহার বলেন, অতীতে ব্যাংক খাতের বহু অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে সামনে এসেছে। গণমাধ্যম না থাকলে এসব অনিয়মের অনেক কিছুই আড়ালে থেকে যেত। অনেক ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেও বাধ্য করেছে।
তিনি বলেন, বর্তমান গভর্নর স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কাছে নতি স্বীকার না করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিদ্যমান নীতিমালা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অর্থ পাচারবিরোধী নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
সেমিনারে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, গত কয়েক দশকে ব্যাংক খাতে উদ্বেগজনক অনেক ঘটনা ঘটেছে। তবে যেসব ব্যাংক সুশাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, সুশাসনের প্রধান উপাদান হলো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে এই দুই উপাদানের ঘাটতি ছিল। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার বড় অংশই পূর্বে গোপন থাকা তথ্যের স্বচ্ছ উপস্থাপনার ফল। নতুন করে খেলাপি ঋণ খুব বেশি বাড়েনি; বরং বাস্তব চিত্র এখন সামনে এসেছে।
মামদুদুর রশীদ বলেন, রাষ্ট্র যদি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তা হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইআরএফ সদস্য ওবায়দুল্লাহ রনি ও সানাউল্লাহ সাকিব। তারা বলেন, বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে সমস্যার মুখে রয়েছে। অতীতে সুদহার নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগ টেকসই হয়নি এবং অর্থনীতির ক্ষতি করেছে।
তাদের উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে লোপাট হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
তারা বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি অলিগার্ক শ্রেণি গড়ে উঠেছে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাশহিদুল ইসলাম জাহিদ।
সেমিনারে বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন যে, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে তথ্যের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের ব্যাংকিং খাত আবারও আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে।
/এসএকে