মাতৃদুগ্ধ পানের বিধান ও সময়সীমা

মাজিদুর রহমান

ইসলাম

প্রতিটি সৃষ্টির রিজিক ও জীবিকা মহান আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় হয়। আল্লাহ মানুষসহ সমগ্র সৃষ্টিজগতের খাদ্য নিশ্চিত করেছেন অত্যন্ত হিকমত ও প্রজ্ঞার

2026-06-08T14:34:01+00:00
2026-06-08T14:34:01+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
ইসলাম
মাতৃদুগ্ধ পানের বিধান ও সময়সীমা
মাজিদুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ২:৩৪ পিএম   (ভিজিট : ১০)
সংগৃহীত ছবি
প্রতিটি সৃষ্টির রিজিক ও জীবিকা মহান আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় হয়। আল্লাহ মানুষসহ সমগ্র সৃষ্টিজগতের খাদ্য নিশ্চিত করেছেন অত্যন্ত হিকমত ও প্রজ্ঞার সঙ্গে। পুরুষ জমিনে চাষ করে, নারী রান্না করে, আর শিশু বিনা পরিশ্রমে মায়ের মাধ্যমে খাদ্য লাভ করে। মায়ের দুধের মধ্যে আল্লাহ শিশুর কল্যাণ রেখেছেন। সন্তানকে দুধ পান করানো, লালন-পালন করা- এসব বিষয়ে ইসলাম নারীর জন্য পুণ্য ঘোষণা করেছে। সন্তানকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করা, তালিম-তারবিয়াত করা, শিক্ষা দেওয়া ইত্যাদি বাবা-মায়ের জন্য সদকায়ে জারিয়া। জাগতিক ও ধর্মীয় উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেষ্ঠতম কর্ম ও উত্তম ফলাফলের মাধ্যম। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘বাচ্চা জন্মগ্রহণ করার পর দুধের যে ফোঁটা বের হয় আর বাচ্চা যখন তা পান করতে থাকে তখন প্রত্যেক ঢোক এবং প্রত্যেক ফোঁটাতে নারী নেকি পেতে থাকে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৪/৩৫২)

সৃষ্টির পূর্বেই মাখলুকের খাবারের ব্যবস্থা করা আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় দয়া। একজন মা দুধ পান করিয়ে তার তৃষ্ণার্ত বাচ্চাকে যেমন তৃপ্ত করতে পারেন তেমন মহান আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদানেরও উপযুক্ত হতে পারেন। বাচ্চাকে দুধ পান করানো মহান আল্লাহর কাছে অনেক পছন্দনীয় আমল। মায়ের জন্য এটি গর্বেরও বিষয়। একজন মায়ের পক্ষ থেকে স্বভাবজাত দাবিও এটি। বিশেষ কোনো অসুবিধা ছাড়া দুধ পান না করালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আল্লাহ তায়ালা নবী মুসার (আ.) মাকে নির্দেশ দিলেন তাকে দুধ পান করাতে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মুসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাকো। অতপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশঙ্কা করো, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।’ (সুরা কাসাস : ৭) 
আরও পড়ুন

ইসলাম বাচ্চাকে দুধ পান করানোর প্রতি উৎসাহিত করেছে। দুধ পান করানোর বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়। আর সন্তানের অধিকারী, অর্থাৎ পিতার ওপর হলো সেসব নারীর খোরপোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। কাউকে তার সামর্থাতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন করা হয় না। আর মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং যার সন্তান তাকেও তার সন্তানের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন করা যাবে না। আর ওয়ারিশদের ওপরও দায়িত্ব এই। 

তারপর যদি পিতা-মাতা ইচ্ছা করে, তা হলে দুই বছরের ভেতরেই নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শক্রমে দুধ ছাড়িয়ে দিতে পারে, তাতে তাদের কোনো পাপ নেই, আর যদি তোমরা কোনো ধাত্রীর দ্বারা নিজের সন্তানদের দুধ খাওয়াতে চাও, তা হলে যদি তোমরা সাব্যস্তকৃত প্রচলিত বিনিময় দিয়ে দাও তাতেও কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ অত্যন্ত ভালো করেই দেখেন।’ (সুরা বাকারা : ১৩৩)

বাচ্চাদের দুধ পান করানোর সর্বোচ্চ সময় দুই বছর। সুরা বাকারার উপরোক্ত আয়াত দ্বারাও তাই বোঝা যায়। সুরা আহকাফের ১৫ নম্বর আয়াতে এসেছে, ‘তাকে (গর্ভে) ধারণ ও দুধ ছাড়ানোর মেয়াদ হয় ত্রিশ মাস’। মানব শিশুর জীবিত জন্মগ্রহণের সর্বনিম্ন মেয়াদ হলো ছয় মাস আর দুধ পান করানোর সর্বোচ্চ মেয়াদ দুই বছর। এ হিসেবে দুই বছর বা চব্বিশ মাস দুধ পানের সময় হয়। তবে কোনো বাচ্চা যদি অতিশয় দুর্বল হয় তা হলে তাকে প্রয়োজনবশত আড়াই বছর পর্যন্ত দুধ পান করানোর সুযোগ আছে। (ফাতাওয়া শামি : ৩/২০৯)। 

সন্তানের বাবা ও অভিভাবকদের উচিত এ সময়ে নবজাতক মাকে খুব বেশি সঙ্গ দেওয়া। দুধ পান করানোর সঠিক পদ্ধতি জানিয়ে দেওয়া এবং সুষম খাবার-দাবারের ব্যাপারে তাকে সচেতন করা। গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত প্রসূতি মায়ের যত্ন নেওয়া পরিবারের লোকদের একান্ত কর্তব্য। তবে নিজের সচেতনতাই সবচেয়ে বড়। এ সময় মাকে স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। কারণ মায়ের প্রভাব শিশুর ওপর পড়ে। 

মায়ের যেমন কোনো উত্তম বিকল্প নেই, ঠিক তেমনি মায়ের দুধেরও কোনো বিকল্প নেই। মায়ের দুধ শিশুর জন্য উত্তম খাদ্য। এতে রয়েছে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ ও উপাদানসমৃদ্ধ এমন খাবার যা শিশু সহজেই হজম করতে পারে। এটি কুদরতের অপূর্ব উপহার। অফুরন্ত নিয়ামত। নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও আদর্শ খাবার। মেডিকেল সায়েন্সও এ কথা স্বীকার করে। মানুষের ব্রেনের যে অংশে খুশি-আনন্দ ও চিন্তা-পেরেশানির অবস্থা সৃষ্টি হয়, এর কাছাকাছি অবস্থান করে মায়ের দুধের কেন্দ্রস্থল। দুধের এই প্রভাব বাচ্চার ওপর পড়ে। অনেকে মায়ের বুকে নেমে আসা প্রথম শাল দুধ খাওয়াতে চান না এটি একটি কুসংস্কার। শাল দুধ শিশুর জন্য প্রাকৃতিক টিকা। 

মায়ের দুধ শিশুর জন্মগত অধিকার। মায়ের দুধ শুধু নবজাতকের ক্ষুধা ও পিপাসাই মিটায় না; বরং বাচ্চার সঙ্গে দৃঢ় বন্ধন তৈরি করে। মায়ের দুধ পানকারী বাচ্চা জ্ঞানী-মেধাবী হয়ে থাকে। অনেক রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাপদে থাকে। নিজেকে রক্ষা করতে পারে। এতে কোনো ধরনের ইনফেকশন দ্বারা বাচ্চার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। মায়ের দুধ সুস্থ, দুর্বল অসুস্থ সব ধরনের বাচ্চাদের জন্য উপকারী। এটা পান করলে বাচ্চা সুস্বাস্থ্যবান হয়। বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করালে শুধু যে বাচ্চার উপকার তা নয়; বরং নবজাতক মায়েরও রয়েছে বহুবিধ উপকার। 

সন্তানকে দুধ খাওয়ালে মা নিজেও উপকৃত হন। প্রসবজনিত রক্তপাত দ্রুত বন্ধ হয়। পরবর্তীতে রক্তস্বল্পতা হয় না। গর্ভজনিত স্ফীত জরায়ু দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। যেসব মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান তাদের স্তন, জরায়ু এবং ডিম্বকোষের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। বুকের দুধ খাওয়ালে স্বাভাবিক জন্মনিয়ন্ত্রণে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া যারা ঘন ঘন গর্ভবতী হতে চান না তাদের জন্যও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। মা ও শিশুর আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হয়। মায়ের দুধ মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যেন এক কুদরতি মেহমানদারি। আল্লাহ সবাইকে এর কদর বোঝার ও উপকার লাভের তাওফিক দান করুন।

এএডি/


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: