একসময় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস কিংবা থালা-বাটি ছিল বাঙালির ঘরের নিত্যসঙ্গী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্টিল, মেলামাইন, কাচ ও সিরামিকের দখলে চলে যায় রান্নাঘর ও খাবার টেবিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও মাটির পাত্রের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
শুধু প্রয়োজনের জন্য নয়, অনেকেই এখন মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার করছেন ফ্যাশন ও লাইফস্টাইলের অংশ হিসেবে। আধুনিক ঘরের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন সবখানেই মাটির পাত্র নতুনভাবে জায়গা করে নিচ্ছে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
মাটির পাত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো ঐতিহ্যের প্রতি নতুন প্রজন্মের আকর্ষণ। অনেক তরুণ-তরুণী এখন নিজেদের সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পেতে চান। ফলে মাটির তৈরি ডিনার সেট, প্লেট, বাটি, চায়ের কাপ, মগ, পরিবেশন বাটি, ওয়াল হ্যাংগিং শোপিস, ফুলদানি এবং বিভিন্ন ঘরসজ্জার উপকরণ ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তিত্বেরও প্রকাশ ঘটায়।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তারা মাটির পাত্রে আধুনিক নকশা, রং ও ফিনিশিং যুক্ত করছেন। ফলে এগুলো শুধু গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, বরং আধুনিক জীবনযাপনেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
দৈনন্দিন জীবনে মাটির তৈজসপত্র
সম্প্রতি মাটির ডিনার সেটের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। পরিবার কিংবা অতিথিদের সামনে মাটির প্লেট, বাটি ও গ্লাসে খাবার পরিবেশন অনেকের কাছে রুচিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, ঈদ কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে মাটির ডিনার সেট ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অনেক রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেও এখন ভাত, ভর্তা, চা কিংবা দেশীয় খাবার পরিবেশনের জন্য মাটির পাত্র ব্যবহার করছে। এতে খাবারের পরিবেশনে একটি আলাদা নান্দনিকতা তৈরি হয়। পাশাপাশি মাটির পাত্রে পরিবেশিত খাবারে গ্রামীণ আবহও পাওয়া যায়।
কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা
মাটির পাত্র জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত এগুলো পরিবেশবান্ধব। প্লাস্টিক বা অন্যান্য কৃত্রিম উপকরণের তুলনায় মাটির পাত্র সহজে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়। দ্বিতীয়ত অনেকেই মনে করেন মাটির পাত্রে রান্না করা বা পরিবেশিত খাবারে স্বাদ ও ঘ্রাণ কিছুটা ভিন্ন এবং প্রাকৃতিক অনুভূতি দেয়।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মাটির পাত্রে সাজানো খাবারের ছবি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে অনেকেই ঘর সাজানো বা অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে মাটির পাত্রকে ট্রেন্ড হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
নতুন প্রজন্মের পছন্দে মাটির ছোঁয়া
বর্তমান সময়ে অনেক নবদম্পতি নতুন সংসারের জন্য মাটির ডিনার সেট কিনছেন। কেউ কেউ ঘরের ডাইনিং স্পেস সাজাতে ব্যবহার করছেন মাটির প্লেট ও শোপিস। আবার উপহার হিসেবেও মাটির তৈরি নান্দনিক সামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। পরিবেশ সচেতনতা, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং নান্দনিকতার সমন্বয়ে মাটির পাত্র নতুন প্রজন্মের কাছে একটি আকর্ষণীয় লাইফস্টাইল উপকরণে পরিণত হয়েছে।
কোথায় পাওয়া যায়
বর্তমানে দেশের প্রায় সব বড় শহরেই মাটির তৈজসপত্র সহজে পাওয়া যায়। রাজধানী ঢাকার নিউমার্কেট, বেইলি রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকার বিভিন্ন হোম ডেকর ও হস্তশিল্পের দোকানে মাটির ডিনার সেট ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কারুশিল্প মেলা, মৌসুমি মেলা এবং হস্তশিল্পভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নানা ধরনের মাটির পণ্য পাওয়া যায়। অনলাইনেও এখন অসংখ্য উদ্যোক্তা মাটির কাপ, প্লেট, বাটি, জগ, ফুলদানি ও ডিনার সেট বিক্রি করছেন। ফলে ঘরে বসেই পছন্দের পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবহারে সতর্কতা
মাটির পাত্র ব্যবহার করার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এগুলো তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর হওয়ায় সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। প্রথমবার ব্যবহারের আগে ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া উচিত। গরম পাত্র সরাসরি ঠান্ডা পানিতে না রাখাই ভালো, এতে ফাটল ধরতে পারে। সঠিক যত্ন নিলে মাটির পাত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব।
দাম কেমন
দাম কেমন
মাটির পাত্রের দাম নির্ভর করে এর নকশা, আকার, রং এবং ফিনিশিংয়ের ওপর। সাধারণ মাটির চায়ের কাপ ৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। ছোট বাটি বা প্লেটের দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। একটি পরিবারের জন্য উপযোগী সাধারণ মাটির ডিনার সেটের দাম সাধারণত দেড় হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। তবে হাতে আঁকা নকশা, গ্লেজ ফিনিশিং বা বিশেষ ডিজাইনের ডিনার সেটের দাম ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে। ফুলদানি, শোপিস ও সাজসজ্জার পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূল্য বৈচিত্র্য দেখা যায়।
মাটির পাত্র শুধু একটি ব্যবহারিক সামগ্রী নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রতীক। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ যখন শেকড়ের কাছে ফিরতে চায়, তখন মাটির তৈরি একটি সাধারণ কাপ কিংবা ডিনার সেটও হয়ে ওঠে আবেগের অংশ। তাই বলা যায়, মাটির পাত্রের এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ধারণ করার এক সুন্দর প্রয়াস।
সময়ের আলো/জেডি