তাই হাংয়ের একটি পুরনো ‘টং লাউ’ ভবনে অবস্থিত দ্য শপহাউসে এখন চলছে জাপানি সিরামিক শিল্পী কানসাই নোগুচির একক প্রদর্শনী। ৩ তলা জুড়ে সাজানো তার অদ্ভুত আকৃতির সিরামিক পাত্রগুলো প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, যেন মাধ্যাকর্ষণের চাপে এগুলো ভেঙে পড়েছে। কোথাও ফাটল ধরা পাত্র বাঁশের ফালি দিয়ে জোড়া দেওয়া, কোথাও আবার ভাঙা অংশে সোনার ছোঁয়া। প্রচলিত নিখুঁত সিরামিকের ধারণা বদলে দিয়ে নোগুচি তৈরি করেছেন এমন এক শিল্প, যেখানে ভাঙন, ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতাই হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের অংশ।
বর্তমানে তার এই অনন্য সৃজনশীলতা শিল্পপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। হংকংয়ে নিজের একক প্রদর্শনী এবং বিখ্যাত ‘ভাঙা ফুলদানি’ তৈরিতে আপসাইক্লিংয়ের ভূমিকা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন।
কানসাই নোগুচির শিল্পকর্ম। ছবি : সংগৃহীত
নোগুচির সাম্প্রতিক কাজগুলো দেখলে তার পুরনো শিল্পচর্চার সঙ্গে পার্থক্যটি সহজেই চোখে পড়ে। মাত্র ৩ বছর আগেও তিনি জাপানি মিনিমালিস্ট সৌন্দর্য এবং প্রাচীন গ্রিক ফুলদানি নির্মাণের অনুপাতকে মিলিয়ে নিখুঁত ও জটিল সিরামিক পাত্র তৈরি করতেন। প্রায় ১ দশক ধরে তার কাজের মূল পরিচয় ছিল ‘মডার্ন ক্লাসিক্যাল’ নান্দনিকতা। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টোকিও আর্ট ফেয়ার এবং চলতি বছরের মার্চে আর্ট বাসেল হংকংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প আয়োজনে তার নতুন, ভাঙা ও ‘অসম্পূর্ণ’ সিরামিকগুলো ব্যাপক মনোযোগ কাড়ে। বর্তমানে দ্য শপহাউসে চলছে তার একক প্রদর্শনী ‘ফর্ম ফলোস ফেইলিওর’, যা ৯ আগস্ট পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
কানসাই নোগুচির শিল্পকর্ম। ছবি : সংগৃহীত
প্রদর্শনীর নামটি আমেরিকান স্থপতি লুইস সুলিভানের আধুনিকতাবাদী নীতি ‘ফর্ম ফলোস ফাংশনের’ বিপরীত। নোগুচি এখানে প্রচলিত ধারণাটিকে বদলে দিয়েছেন। তিনি কাঠামোগত ভাঙন এবং চুল্লিতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাকেই চূড়ান্ত শিল্প রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
নোগুচির শিল্পদৃষ্টিতে বড় পরিবর্তন আসে মুক্তো চাষ শিল্প নিয়ে গবেষণার সময়। প্রায় ৩ বছর আগে তিনি জানতে পারেন, চাষ করা মুক্তোর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাতিল করা হয়, কারণ সেগুলো গয়না তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নিখুঁত গোলাকার হয় না। এই অপচয় তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি বাতিল হওয়া বিকৃত মুক্তোগুলো সংগ্রহ করে গুঁড়ো করেন এবং সিরামিক স্লিপের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করেন বিশেষ ধরনের সাদা গ্লেজ। এই অভিজ্ঞতাই তার শিল্পভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে। এর আগে চুল্লি থেকে বের হওয়ার পর সামান্য ত্রুটি থাকলেও তিনি সিরামিক ফেলে দিতেন। কিন্তু বাতিল মুক্তোর মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়ার পর তার উপলব্ধি বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, ত্রুটির কারণে কোনো কিছু ফেলে দেওয়া ঠিক নয়।
অ্যাপোলো ইয়াকশি। ছবি : সংগৃহীত
নোগুচি বলেন, ‘ভাঙন আমার উদ্দেশ্য নয়, এটি সাধারণত পোড়ানোর সময় ঘটে। এটি প্রকৃতির কাজ, আর মেরামত হলো আমার কৃত্রিম প্রয়াস।’
প্রদর্শনীর ‘অ্যাপোলো ইয়াকশি’ নামের একটি পাত্র এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথম দেখায় এটি হৃদয় আকৃতির মনে হলেও আসলে এর নকশা তৈরি হয়েছে গ্রিক পুরাণের দেবতা অ্যাপোলোর ঘোড়ার ধড়ের আদলে।
নোগুচির মতে, ‘নিখুঁত সিরামিক তৈরি করা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হলেও মানসিকভাবে তুলনামূলক সহজ। কারণ, সেখানে শিল্পীর সামনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। কিন্তু অনিয়মিত আকৃতির সিরামিক তৈরি করার সময় কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে না। অজানার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সেই অনিশ্চয়তাই তাকে বেশি আকর্ষণ করে।’
তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজে দেখা যায় ‘কাসুগাই’ নামে ধাতব জোড়ার ব্যবহার। কাঠ বা সিরামিকের ভাঙা অংশ জোড়া দিতে ব্যবহৃত এই কৌশলের মাধ্যমে নোগুচি ফাটলকে লুকিয়ে না রেখে, বরং দৃশ্যমান করে তুলেছেন। তার শিল্প যেন বলে- জীবনে কিছুই অপচয় নয় এবং অসম্পূর্ণতার মধ্যেও অনন্য মূল্য রয়েছে।
এই জিরো-ওয়েস্ট নীতি সিরামিক ছাড়িয়েও বিস্তৃত। সিরামিকের বাইরেও তিনি ফেলে দেওয়া বা অব্যবহৃত উপাদানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। জাপানে তিনি বন্য হরিণ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক জিলেটিন আঠা ব্যবহার করেন। সেই আঠার সঙ্গে সিরামিক চুল্লির চিমনি থেকে সংগ্রহ করা কালি মিশিয়ে তৈরি করেন ঐতিহ্যবাহী কালি, যা তিনি ক্যালিগ্রাফি এবং সিরামিক প্যানেলে ব্যবহার করেন।
নোগুচির শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটিও তার শিল্পের মতোই অন্যরকম। ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন সফল আরঅ্যান্ডবি সংগীতশিল্পী। সংগীতজগতের চাপ ও ক্লান্তিতে একসময় তিনি গান থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। সংগীতের প্রকৃত উৎস খুঁজতে তিনি পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানেই তিনি জাপানি-আমেরিকান শিল্পী ইসামু নোগুচির কাজের সংস্পর্শে আসেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে ভিজ্যুয়াল আর্টের দিকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি সংগীত ছেড়ে সিরামিক শিল্পের চর্চা শুরু করেন।
৭ মিটার দীর্ঘ শিল্পকর্মের সঙ্গে নোগুচি। ছবি : সংগৃহীত
তবে, সংগীত তার জীবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তার কাজে এখনো সংগীতের ছন্দ বিদ্যমান। ক্যালিগ্রাফি করার সময় নোগুচি যে সংগীত শোনেন, তার প্রভাব তার কাজে আবেগের সঞ্চার করে। প্রদর্শনীর ‘কোটোবা’ নামের কাজটির অনুপ্রেরণাও এসেছে একটি হিপ-হপ গানের মটো থেকে।
এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি হলো ৭ মিটার দীর্ঘ একটি বিশাল ক্যালিগ্রাফি স্ক্রল ‘হিফু মিয়া’। এতে যেন ধরা পড়েছে নোগুচির নিজের জীবনের যাত্রা- একজন আরঅ্যান্ডবি সংগীতশিল্পী থেকে সিরামিক শিল্পী হয়ে ওঠা এবং প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সাহস।
কানসাই নোগুচি তার শিল্প দ্বারা মূলত আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করেন- ভাঙনের দাগ, ত্রুটি এবং অসম্পূর্ণতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য!