কিনসুগি শিল্পে ভাঙা জিনিসকে আরও সুন্দর ও মূল্যবান রূপে ফিরিয়ে আনা হয়। গ্রাফিক : সময়ের আলো
অনেক মানুষের স্বভাবই হলো প্রতিটি কাজে নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করা। সামান্য ভুল বা ব্যর্থতাকেও তারা সহজে মেনে নিতে পারেন না। অথচ জাপানের একটি প্রাচীন শিল্পকলা শেখায়, ভুল বা ভাঙনই কখনও কখনও নতুন সৌন্দর্যের জন্ম দিতে পারে। সেই শিল্পকলার নাম কিনসুগি, যা ক্ষততে দেয় সোনার প্রলেপ!
সাধারণত কোনো মাটির পাত্র বা সিরামিক ভেঙে গেলে আমরা সেটি ফেলে দেই বা আর ব্যবহার করি না। কিন্তু কিনসুগি শিল্পে ভাঙা জিনিসকে বাতিল না করে, সেটিকেই আরও সুন্দর ও মূল্যবান রূপে ফিরিয়ে আনা হয়।
কিনসুগি শিল্পকর্মের ফুলদানি। ছবি : সংগৃহীত
‘কিনসুগি’ শব্দের অর্থ হলো ‘সোনালি জোড়’ বা ‘সোনা দিয়ে মেরামত করা’। এই পদ্ধতিতে ভেঙে যাওয়া মাটির পাত্র বা সিরামিকের টুকরোগুলো বিশেষ আঠার সঙ্গে সোনা, রুপো বা প্ল্যাটিনামের গুঁড়ো মিশিয়ে জোড়া লাগানো হয়। আরও দারুণ ব্যপার হলো, এতে ভাঙনের দাগ লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয় না। বরং সোনালি রেখার মাধ্যমে সেই ফাটলগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে, ভাঙনের চিহ্নই হয়ে ওঠে নতুন সৌন্দর্যের প্রধান আকর্ষণ।
কিনসুগির সূচনা হয় জাপানে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, জাপানের শোগুন আশিকাগা ইয়োশিমাসার প্রিয় চায়ের কাপ ভেঙে গেলে তিনি সেটি মেরামতের জন্য চীনে পাঠান। কিন্তু ফিরে আসার পর দেখেন, কাপটি ধাতব ক্লিপ দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে, যা তার কাছে মোটেও আকর্ষণীয় মনে হয়নি। এরপর তিনি জাপানের কিছু দক্ষ কারিগরের সাহায্য নেন। তারা এমন একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যাতে ভাঙা জিনিস শুধু মেরামতই নয়, আগের চেয়েও বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। এভাবেই জন্ম নেয় কিনসুগি শিল্প।
কিনসুগি শিল্পের নান্দনিক শো-পিস। ছবি : সংগৃহীত
প্রথম দেখায় এটি সাধারণ একটি মেরামতের কৌশল মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে গভীর এক দর্শন। কিনসুগি জাপানের ওয়াবি-সাবি দর্শনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এই দর্শন বলে, অপূর্ণতা, সরলতা এবং সময়ের ছাপের মধ্যেই প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। তাই ভাঙনকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে জীবনের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখা হয়। একটি ফাটল ধরা বা ভেঙে যাওয়া পাত্র যেমন তার অতীতের গল্প বহন করে, তেমনি শিল্পীর হাতে নতুন রূপ পেয়ে আবারও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই কিনসুগি শিল্প জীবনের এক শক্তিশালী প্রতীক। কেননা, মানুষের জীবনেও আঘাত, ব্যর্থতা কিংবা কঠিন সময় আসে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত শক্তি। কিনসুগির সোনালি ক্ষত যেন নতুন করে ভিন্নরকম সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের বাঁচতে শেখায়।
বর্তমানে জাপানের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বেই কিনসুগির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। ঘর সাজানোর সামগ্রী, গয়না, ফ্যাশন এবং আধুনিক শিল্পকলাতেও এই প্রাচীন শিল্পরীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।