দোকান থেকে অনলাইন— ওষুধ এখন হাতের কাছেই

তাসলিমা নীলু

ফিচার

রাত তখন গভীর। হঠাৎ পরিবারের কারও প্রয়োজন হলো জরুরি কোনো ওষুধ। সাধারণ সময়ে হলে কাছের ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কেনা খুব

2026-09-22T09:32:50+00:00
2026-09-22T09:32:50+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
দোকান থেকে অনলাইন— ওষুধ এখন হাতের কাছেই
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩২ এএম 
ঘরে বসে মোবাইল ফোনে অর্ডার করেও ওষুধ পাওয়ার সুবিধা বর্তমান স্বাস্থ্যসেবাকে অনেক বেশি সহজলভ্য করেছে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
রাত তখন গভীর। হঠাৎ পরিবারের কারও প্রয়োজন হলো জরুরি কোনো ওষুধ। সাধারণ সময়ে হলে কাছের ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কেনা খুব সহজ, কিন্তু মধ্যরাতে দোকান বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তার। আবার অসুস্থ ব্যক্তি বা বয়স্ক মানুষের পক্ষে বাইরে গিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করাও সবসময় সম্ভব হয় না। 

এমন পরিস্থিতিতে ২৪ ঘণ্টার ফার্মেসি সেবাই মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রাস্তার পাশের ২৪ ঘণ্টার দোকান থেকে সরাসরি ওষুধ নেওয়ার সুযোগ, আবার ঘরে বসে মোবাইল ফোনে অর্ডার করেও ওষুধ পাওয়ার সুবিধা বর্তমান স্বাস্থ্যসেবাকে অনেক বেশি সহজলভ্য করেছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এখন এমন ফার্মেসি দেখা যায়, যেগুলো গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। এর মধ্যে লাজ ফার্মার মতো বড় ফার্মেসি চেইনের রয়েছে একাধিক শাখা এবং অনলাইন অর্ডারের ব্যবস্থাও। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ১২০টির বেশি আউটলেট থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং প্রেসক্রিপশন আপলোড করে ওষুধ অর্ডারের সুবিধাও রয়েছে।

তবে অনেক সময় বিশেষ কারণে বা দুর্যোগের সময় এসব ২৪ ঘণ্টার ফার্মেসি খোলা নাও পাওয়া যেতে পারে। এখানেই অনলাইন ফার্মেসির গুরুত্ব। ই-ফার্মেসি বাংলাদেশে  ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যেখান থেকে ঘরে বসেই প্রেসক্রিপশন এবং ওটিসি ওষুধ অর্ডার করা যায়। অনলাইন ফার্মেসির সুবিধা হলো ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই। 

অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, ব্যস্ত চাকরিজীবী কিংবা রাতে বাইরে যেতে অনিচ্ছুক পরিবারের জন্য এটি বেশ কার্যকর। প্রেসক্রিপশনের ছবি পাঠিয়ে অর্ডার করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো অর্ডারের তথ্য থেকে একই ওষুধ আবার অর্ডার করাও সহজ হয়।

বর্তমানে ঘরে বসেই ওষুধ অর্ডার করা যায়, ই-ফার্মা, আরোগ্য, মেড ইজি, মেডএক্স, হেলথএক্সবিডির মতো অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্মে। প্রয়োজনীয় ওষুধের নাম লিখে খোঁজা, প্রেসক্রিপশনের ছবি আপলোড করা, অর্ডার নিশ্চিত করা এবং অনেক ক্ষেত্রে ডেলিভারি ট্র্যাক করার সুবিধা পাওয়া যায়। আরোগ্যর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ৬৪ জেলায় ডেলিভারি দিয়ে থাকে। ঢাকায় এক দিনের মধ্যে ডেলিভারির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এক থেকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে ডেলিভারি দিয়ে থাকে।

অনলাইন ফার্মেসি প্রসঙ্গে স্পাইন অ্যান্ড অর্থোপেডিক হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক ডা. সারোয়ার জাহান বলেন, ‘ঘরে বসে সহজেই ওষুধ অর্ডার করা যায় বলে প্রবীণ, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও ব্যস্ত মানুষদের জন্য উপকারী। যেসব এলাকায় সব ওষুধ পাওয়া যায় না, অনলাইন থেকে তা সহজে পাওয়া যায়। তবে অসাধু বা অনুমোদনহীন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ভেজাল, নিম্নমানের কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়ার একটি বড় ঝুঁকি থেকে যায়।’

অনলাইন ফার্মেসি এখন শুধু ঢাকার মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার বাইরে বসবাসকারী মানুষও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওষুধ অর্ডার করতে পারছেন। তবে এখানে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা দরকার। ‘সারা দেশে ডেলিভারি’ মানেই ‘সারা দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেলিভারি’ নয়। রাজধানী বা বড় শহরে দ্রুত ডেলিভারি পাওয়া গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় লাগতে পারে। অনলাইন ফার্মেসির ক্ষেত্রে ডেলিভারি সময় একটি বড় বিষয়। জরুরি মুহূর্তে অর্ডার করে অপেক্ষা করা সম্ভব নাও হতে পারে। পণ্য স্টকে না থাকা, ডেলিভারি বিলম্ব, ভুল ঠিকানা বা প্রযুক্তিগত সমস্যাও হতে পারে।


মেড ইজির প্রেস রিলিজ অফিসার আরেফিন জামান বলেন, ‘আমরা অনলাইনে প্রেসক্রিপশন ও সাধারণ ওষুধ অর্ডারের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ, ল্যাব টেস্ট এবং স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকি। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এলাকায় এক দিনের মধ্যে ডেলিভারি দিয়ে থাকি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সাধারণত দুই-তিন দিনের মধ্যে ডেলিভারি দেওয়া হয়। আমরা ২৪/৭ কাস্টমার সাপোর্ট দিয়ে থাকি।’

এদিকে ২৪ ঘণ্টার ফিজিক্যাল ফার্মেসির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ওষুধ পাওয়া। রাতে হঠাৎ জ্বর, ব্যথা, ডায়াবেটিসের নিয়মিত ওষুধ শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে হলে কাছের খোলা ফার্মেসি অনেক সময় দ্রুত সমাধান দিতে পারে। দোকানে গিয়ে ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও থাকে। বিশেষ করে কোনো ওষুধের নাম, মাত্রা বা ব্যবহার নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলে সরাসরি জিগ্যেস করা যায়। এ রকম অনেক ফার্মেসি আছে। যেমন— আইডিয়াল ফার্মা, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ফার্মেসি, মর্ডান ফার্মা, আপন ফার্মা, আল হেলাল মেডিসিন কর্নার, মদিনা ফার্মেসি, মাল্টি ফার্মা লিমিটেড, আল শেফা, আদ-দ্বীন হাসপাতাল, লাইফ ফার্মা, পিপলস ফার্মেসি ইত্যাদি।

পিপলস হসপিটালের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা অফিসিয়াল পাইকারি ডিস্ট্রিবিউটর বা ডিলারদের কাছ থেকে সরাসরি ওষুধ সংগ্রহ করে থাকি। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজন মেটাতে কিছু ওষুধ নিকটস্থ অনুমোদিত হোলসেল মার্কেট থেকেও সংগ্রহ করা হয়। যেখানে

অথেনটিক প্রোডাক্টের গ্যারান্টি থাকে। সার্বক্ষণিক খোলা থাকায় জরুরি মুহূর্তে, বিশেষ করে শেষ রাতে বা ছুটির দিনে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ অনায়াসেই পাওয়া যায়।’

লাজ ফার্মার কলাবাগান শাখার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মো. তনু রহমান বলেন, ‘কাস্টমারদের কাছে বর্তমানে ২৪ ঘণ্টা ফার্মেসি বললে যেটির কথা মাথায় আসে তা হলো লাজ ফার্মা। আমরা কলাবাগান এবং ঢাকা মেডিকেল শাখায় এই ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দিয়ে থাকি। লাজ ফার্মা তার প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক। মোটামুটি জরুরি প্রয়োজনে আমাদের এখানে সব ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। আমরা আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম বজায় রাখতে সর্বদা মানুষের কল্যাণে কাজ করে থাকি।’

তবে সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। ফিজিক্যাল ফার্মেসির ক্ষেত্রে অনেক সময় সব দোকানে কাঙ্ক্ষিত ওষুধ না পাওয়া। একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা বিশেষ ধরনের ওষুধ প্রয়োজন হলে একাধিক দোকানে খুঁজতে হতে পারে। আবার ২৪ ঘণ্টা খোলা দোকান সব এলাকায় নেই। এসব ক্ষেত্রে অনলাইন ফার্মেসি সহায়কের ভূমিকা পালন করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে অনলাইন বা অফলাইন, কোনো মাধ্যমকেই নিজের চিকিৎসার বিকল্প ভাবা উচিত নয়। বিশেষ করে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কেনা বা ব্যবহার করা ঠিক নয়। অনলাইনে ওষুধের নাম দেখে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় করাও ঝুঁকিপূর্ণ। 

সিটি ব্যাংকের সহকারী ব্যবস্থাপক ফখরুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘আমি সবসময় ২৪ ঘণ্টার ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে থাকি। মাঝেমধ্যে আবার দেখা যায় আমি যেতে না পারলে অনলাইন থেকেও কেনা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হইনি। সবসময় ভালো ওষুধ পেয়েছি।’

সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার ফার্মেসি এবং অনলাইন ফার্মেসি মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন ধরনের সুবিধা তৈরি করেছে। একেবারে জরুরি মুহূর্তে কাছের ২৪ ঘণ্টার ফিজিক্যাল ফার্মেসি দ্রুত সহায়তা দিতে পারে, আর তৎক্ষণাৎ বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে অনলাইন ফার্মেসি হয়ে উঠতে পারে সহজ বিকল্প।

কাছাকাছি নির্ভরযোগ্য ফার্মেসির ঠিকানা ও ফোন নম্বর আগে থেকেই সংরক্ষণ করে রাখা যেমন কাজে আসে, তেমনি পরিচিত অনলাইন ফার্মেসিতে নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধের তথ্যও রাখা যেতে পারে। প্রযুক্তির সুবিধা ও প্রচলিত ফার্মেসির সরাসরি সেবা দুইয়ের সমন্বয়ই ভবিষ্যতের ওষুধ কেনার ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে/এমকে
  বিষয়:   দোকান  অনলাইন  ওষুধ  হাত 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: