৬ আগস্ট বিশ্বের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবিধুর দিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাপানের হিরোশিমা শহরে মানব ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধকালীন পারমাণবিক হামলা চালানো হয়, যা মুহূর্তেই একটি জনবহুল শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
এই ঘটনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের নাম। ম্যানহাটন প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক পরিচালক হিসেবে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তার নেতৃত্ব ইতিহাসে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পরবর্তী সময়ে তার নৈতিক দ্বন্দ্বও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেই জীবনকাহিনি, বৈজ্ঞানিক সাফল্য এবং আত্মসংঘাতকে কেন্দ্র করেই নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান নির্মাণ করেন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ওপেনহাইমার।
২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। পরবর্তীতে এটি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতাসহ মোট ৭ টি অস্কার জিতে বছরের অন্যতম সফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় পারমাণবিক বিস্ফোরণের দৃশ্যকে ঘিরে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এত বিশাল দৃশ্য নিশ্চয়ই আধুনিক কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলান বরাবরের মতোই বাস্তবধর্মী নির্মাণশৈলীর ওপর ভরসা করেন। তিনি সীমিত পরিসরে বাস্তব বিস্ফোরণের বিশেষ প্রভাব ব্যবহার করে দৃশ্যটি ধারণ করেন, যা পর্দায় বিস্ময়কর বাস্তবতা এনে দেয়।
ওপেনহাইমারের চরিত্রে অভিনয় করেন আইরিশ অভিনেতা কিলিয়ান মারফি। এই চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই চরিত্রের জন্য তাকে কোনো অডিশন দিতে হয়নি। নোলানের আগের কয়েকটি চলচ্চিত্রে তার কাজ পরিচালকের এতটাই আস্থা অর্জন করেছিল যে, একটি ফোনকলেই তাকে প্রধান চরিত্রের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে মারফি নিজেই বলেন, সেই ফোনকল ছিল তার অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
চলচ্চিত্রটির বড় অংশের শুটিং হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে, যেখানে ঐতিহাসিক ট্রিনিটি পরীক্ষার আবহ পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অভিনেতা, বিজ্ঞানবিষয়ক পরামর্শক এবং নির্মাণদলের সদস্যরা একসঙ্গে অবস্থান করে কাজ করেন, যা পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়াকে আরও নিবিড় ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।
নোলানের নির্মাণশৈলীর আরেকটি বিশেষ দিক ছিল চিত্রনাট্য ও চিত্রগ্রহণের পদ্ধতি। তিনি গল্পের বড় অংশ ওপেনহাইমারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখেছিলেন, যাতে দর্শক চরিত্রটির মানসিক টানাপোড়েন ও নৈতিক সংকটকে আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন। একইসঙ্গে চলচ্চিত্রটির অধিকাংশ দৃশ্য আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। তবে, সাদাকালো দৃশ্য ধারণের উপযোগী আইম্যাক্স ক্যামেরা না থাকায় নির্মাতারা বিশেষভাবে একটি নতুন সংস্করণের ক্যামেরা তৈরি করেন। এর ফলে রঙিন ও সাদাকালো দৃশ্যের মধ্যেও প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য বজায় রেখে অনন্য এক চলচ্চিত্রভাষা সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।
হিরোশিমার বিভীষিকা আজও মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অমোচনীয় কালো অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয় এবং বিশ্বকে বারবার মনে করিয়ে দেয় পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ পরিণতির কথা। ওপেনহাইমার চলচ্চিত্রটি ওপেনহাইমারের জীবনী তুলে ধরার পাশাপাশি মানুষকে যুদ্ধ ও পারমানবিক অস্ত্রের সেই ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে আমরা এমন এক সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সতর্ক না হলে, মানবতা ও শান্তি বজায় না রাখলে ধ্বংস অনিবার্য পরিণতি হয়ে ধরা দেবে।
সময়ের আলো/মহু