মাথাব্যথা, জ্বর, সর্দি-কাশি, গ্যাস্ট্রিক কিংবা শরীর ব্যথা হলেই অনেকের প্রথম কাজ হয় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খাওয়া। কারও আগের প্রেসক্রিপশনে থাকা ওষুধ, কারও পরিচিতজনের পরামর্শ কিংবা ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতার কথায় শুরু হয়ে যায় ওষুধ খাওয়া। অনেক সময় উপসর্গ সাময়িকভাবে কমে যাওয়ায় মনে হয়, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অথচ নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ খাওয়ার এই অভ্যাস কখনো কখনো বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রোগ নির্ণয়, ওষুধ নির্বাচন, মাত্রা নির্ধারণ এবং কত দিন ওষুধ চলবে— এসব বিষয় রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, অন্য রোগ এবং একই সঙ্গে সেবন করা ওষুধের ওপর নির্ভর করে। একই উপসর্গ থাকলেও সবার জন্য একই ওষুধ কার্যকর বা নিরাপদ নাও হতে পারে।
উপসর্গ কমলেই রোগ সেরে যায় না
নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রোগের মূল কারণ আড়ালে থেকে যাওয়া। যেমন জ্বর হলে জ্বর কমানোর ওষুধ খেয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু জ্বরের পেছনে সংক্রমণ, ডেঙ্গু, মূত্রনালির সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণ থাকলে শুধু উপসর্গ কমিয়ে রাখলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন হয়। ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশি বা অনেক সাধারণ সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন ছাড়া কিংবা ভুল মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
ভুল ওষুধে হতে পারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
প্রতিটি ওষুধেরই কিছু সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে অ্যালার্জি, বমি, মাথা ঘোরা, ঘুম ঘুম ভাব বা পেটের সমস্যা হতে পারে। আবার কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে কিডনি, লিভার, পাকস্থলী কিংবা হৃদযন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনি, লিভার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ। গর্ভবতী নারী, শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রেও ওষুধের মাত্রা ও ধরন নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া। একজন ব্যক্তি যদি একাধিক রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খান, নতুন কোনো ওষুধ নিজের ইচ্ছায় শুরু করলে একটির সঙ্গে অন্যটির বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ফলে চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত ব্যবহৃত সব ওষুধের তথ্য জানানো জরুরি।
পুরোনো প্রেসক্রিপশনও সবসময় প্রযোজ্য নয়
অনেকে মনে করেন, আগে একই ধরনের সমস্যা হয়েছিল এবং একটি ওষুধে ভালো হয়েছিল, তাই এবারও সেটিই খাওয়া যাবে। কিন্তু একই উপসর্গের কারণ প্রতিবার এক নাও হতে পারে। আগের প্রেসক্রিপশনও বর্তমান অবস্থার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই পুরোনো প্রেসক্রিপশন দেখে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি ওষুধের নাম, মাত্রা, কতবার এবং কত দিন খেতে হবে, তা ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত। কোনো ওষুধ খাওয়ার পর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
ওষুধ রোগ সারানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, কিন্তু সঠিক রোগ নির্ণয় ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই এর সুফল পাওয়া যায়। তাই সামান্য অসুস্থতায়ও নিজের অভিজ্ঞতা, প্রতিবেশীর পরামর্শ কিংবা ফার্মেসির কারও কথায় ওষুধ শুরু না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
লেখক : মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড ও নিউরোলজিক্যাল সার্জন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল
সময়ের আলো/জেডআই