জীবনে সবচেয়ে বেশি বলা শব্দগুলোর একটি হয়তো ‘পরে’। পরে ফোন করব, পরে দেখা হবে, পরে সময় দেব, পরে কথা বলব। আজ একটু ব্যস্ততা আছে, কিছু কাজ শেষ করতে হবে। কাল হয়তো সময় পাওয়া যাবে। এভাবেই একটি দিন থেকে আরেকটি দিন, একটি সপ্তাহ থেকে আরেকটি মাস চলে যায়। আমরা বুঝতেই পারি না, যেসব মুহূর্তকে পরে দেখা যাবে বলে রেখে দিচ্ছি, সেগুলোর অনেকগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না।
জীবন আসলে কোনো একদিন হঠাৎ বদলে যায় না। প্রতিদিন একটু একটু করে বদলায়। শৈশব হারিয়ে যায় বড় হওয়ার ভিড়ে, বন্ধুত্ব দূরে সরে যায় ব্যস্ততার কারণে, পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা ছোট হয়ে আসে কয়েক মিনিটের কথায়। একসময় যে মানুষগুলোকে প্রতিদিন দেখতাম, তাদের সঙ্গে দেখা করতেও ক্যালেন্ডারে সময় খুঁজতে হয়।
একদিন পুরোনো কোনো ছবি সামনে এলে তখন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবিতে দেখা যায়, সবাই হাসছে। কেউ হয়তো পাশে নেই, কেউ অন্য শহরে, কেউ জীবনের অন্য অধ্যায়ে। অথচ ছবির সেই মুহূর্তে আমরা কেউ জানতাম না, সেটিই হয়তো একসঙ্গে কাটানো শেষ বিকেলগুলোর একটি।
শৈশবে সুখের জন্য খুব বেশি কিছু লাগত না। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে যাওয়া, বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা, ঈদের নতুন পোশাক, ছুটির সকালে মায়ের ডাকে বিরক্ত হওয়া, বাবার সঙ্গে গল্প করা কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই অনেকক্ষণ হাসতে পারাই ছিল আনন্দ। তখন জীবনকে উপভোগ করার জন্য আলাদা করে সময় বের করতে হতো না। জীবনটাই ছিল সময়।
বড় হওয়ার পর সেই সহজ জীবন কোথায় যেন হারিয়ে যায়। দায়িত্ব বাড়ে, চাহিদা বাড়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা বাড়ে। আমরা ভাবি, আরও একটু আয় করতে পারলে, আরও একটু সফল হতে পারলে, আরও কিছু সঞ্চয় করতে পারলে তারপর নিশ্চিন্তে বাঁচব। কিন্তু সেই ‘আর একটু’ কখনো শেষ হয় না।
একটি লক্ষ্য পূরণ হওয়ার আগেই আরেকটি লক্ষ্য সামনে আসে। কাজের চাপ কমে না, ব্যস্ততা শেষ হয় না। আমরা ভবিষ্যতের জন্য এত কিছু করতে থাকি যে বর্তমানটুকু বাঁচার কথাই ভুলে যাই।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় হয় না। বন্ধুর ফোন পরে দেওয়ার জন্য রেখে দেওয়া হয়। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা বারবার পিছিয়ে যায়। মনে হয়, মানুষগুলো তো আছেই। কাল কথা বলা যাবে, আগামী সপ্তাহে দেখা হবে।
কিন্তু জীবন কোনো আগামীকালের নিশ্চয়তা দেয় না।
একদিন হঠাৎ ঘরের একটি চেয়ার খালি হয়ে যায়। যে মানুষটির সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলতাম, তার কণ্ঠ আর শোনা যায় না। যে বন্ধুর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা হতো, সে হয়তো অন্য শহরে চলে যায়। যে মানুষটিকে ভেবেছিলাম সবসময় পাশে পাব, কোনো এক অপ্রত্যাশিত সময়ে তাকেও হারিয়ে ফেলি।
তখন মনে হয়, আরও একটু সময় যদি দেওয়া যেত। আরও একবার কথা বলা যেত। আরও একদিন পাশে বসা যেত। কিন্তু তখন সময় থাকে না, থাকে শুধু আফসোস।
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, আমরা অনেক কিছুর মূল্য বুঝি হারানোর পর। উপস্থিতিকে স্বাভাবিক ধরে নিই, যতক্ষণ না অনুপস্থিতি আমাদের সেই উপস্থিতির গুরুত্ব শেখায়।
পুরোনো গান তাই কখনো কখনো বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে। কোনো গন্ধ ফিরিয়ে নেয় শৈশবের দুপুরে। পুরোনো ছবি ফিরিয়ে দেয় এমন কিছু মানুষের কাছে, যাদের কাছে বাস্তবে আর ফেরা সম্ভব নয়। স্মৃতি আমাদের অতীতে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু অতীতকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।
তাই জীবনকে শুধু বড় করার চেষ্টায় না থেকে সুন্দর করেও বাঁচতে হয়। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলার জন্য বিশেষ কোনো উপলক্ষের দরকার নেই। বন্ধুকে ফোন করার জন্য কোনো কারণ লাগে না। বাবা-মায়ের পাশে বসার জন্য কোনো জরুরি কাজের ফাঁক খুঁজতে হয় না। সন্তানের গল্প শুনতে গিয়ে মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকানোও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে।
কারণ জীবন বড় কোনো ঘটনার সমষ্টি নয়। জীবনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তে। এক কাপ চা, পরিবারের সঙ্গে কয়েক মিনিটের গল্প, বন্ধুর অকারণ হাসি, প্রিয় মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটা, বৃষ্টির শব্দ শোনা কিংবা দিনের শেষে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, এসবই একসময় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে ওঠে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, একদিন সব দায়িত্ব শেষ হলে নিজের মতো করে বাঁচব। একদিন টাকা হলে ঘুরতে যাব, একদিন সময় হলে পরিবারের সঙ্গে বসব, একদিন সুযোগ হলে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে অনেক কথা বলব। অথচ সেই ‘একদিন’ আসার আগেই জীবন অনেক দূর এগিয়ে যায়।
তাই কিছু কথা পরে না রেখে আজই বলা ভালো। ভালোবাসা থাকলে প্রকাশ করা ভালো। ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া ভালো। কাউকে মনে পড়লে ফোন করা ভালো। পাশে থাকা মানুষটির পাশে একটু বেশি সময় বসা ভালো।
কারণ সময় ফিরে আসে না। মানুষও সবসময় ফিরে আসে না।
জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে হয়তো কেউ হিসাব করবে না কত টাকা জমিয়েছিল, কত বড় বাড়ি বানিয়েছিল কিংবা কত মানুষ তাকে চিনত। মনে পড়বে হয়তো সেই মানুষগুলোর কথা, যাদের সঙ্গে আরও কিছু সময় কাটানো যেত। মনে পড়বে সেই বিকেলগুলোর কথা, যেগুলো ব্যস্ততার কারণে হারিয়ে গেছে। মনে পড়বে বলা হয়নি এমন কিছু কথা।
তখন হয়তো সবচেয়ে বড় আফসোস হবে একটি ছোট শব্দকে ঘিরে, ‘পরে’।
কারণ জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আমাদের ছেড়ে যায় কোনো শব্দ না করেই। আমরা শুধু ভাবতে থাকি, সময় তো আছেই।
আসলে সময় থাকে না। থাকে শুধু আজ, এই মূহুর্ত।
আর এই আজকেই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি বাঁচা দরকার।
সময়ের আলো/এমকে