তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

কলকাতা এমন একটি শহর, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আনন্দের গল্প। কলকাতাকে ভালোভাবে চিনতে হলে, অনেকদিন ধরে

2026-08-05T17:28:10+00:00
2026-08-05T17:44:06+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
ফিচার
তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:২৮ পিএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ৫:৪৪ পিএম
পায়ে হেঁটে কলকাতার রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতে হয়। গ্রাফিক : সময়ের আলো
কলকাতা এমন একটি শহর, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আনন্দের গল্প। কলকাতাকে ভালোভাবে চিনতে হলে, অনেকদিন ধরে ঘুরে, পায়ে হেঁটে তার রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতে হয়। 

আমি কলকাতা গিয়েছিলাম বোলপুর থেকে। যখন বোলপুর স্টেশনে এসে টোটো থেকে নামলাম, তখন সরাসরি কলকাতাগামী ট্রেন আসতে দেরি। তাই বর্ধমানের ট্রেন আসন্ন দেখে বর্ধমানেরই টিকিট কেটে ফেললাম। বর্ধমানে নেমে আবার হাওড়ার টিকিট কাটলাম। যখন হাওড়া নামলাম, তখন আলোর পসরা সাজিয়ে রাত নেমেছে কলকাতা শহরে। হাওড়া একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশন ছিল। এটা আমার প্রথম হাওড়া দেখা। কী এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। সত্যিই হাওড়া অনেক বড় স্টেশন এবং খুব সুন্দর। ব্রিটিশ আমলের লাল বিল্ডিংয়ের জন্য তা আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগে। হাওড়া নেমেই প্রথম যেই অনুভূতি হয়েছিল কলকাতা সম্পর্কে, তা হলো- কলকাতার মানুষ এত ব্যস্ত কেন? কারণ, আগে কখনও কোনো স্টেশনে একসঙ্গে এত মানুষ দেখিনি, আর সবাইকে এভাবে ছুটতেও দেখিনি, যেন কারও দিকে কারও ফিরে তাকানোর সময় নেই!

হাওড়া স্টেশন। ছবি : সংগৃহীত

হাওড়া স্টেশন। ছবি : সংগৃহীত


হাওড়া নেমে আমরা হলুদ ট্যাক্সি নিলাম। কলকাতার ঐতিহ্য হলুদ ট্যাক্সিতে চড়ার শখ ছিল, তা পূরণ হলো। ট্যাক্সিতে করে আমরা দমদম গেলাম। জানালা দিয়ে কলকাতা শহর দেখছিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, সত্যিই কী আমি আমার প্রাণের শহর, রবি বাবুর শহর, অনুপমের শহর কলকাতায় চলে এসেছি!


পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ থাকার কারণে অনেক খুঁজেও আমরা হোটেল পাইনি। তাই আমাদের থাকতে হয়েছিল দমদমের একটা পুরনো বাসার রুম ভাড়া করে। কলকাতায় হোটেল না পেয়ে প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিল। অবশ্য হোটেলে থাকার চেয়ে বাসার পরিবেশে থাকার অভিজ্ঞতা দারুণ ছিল। হোটেলে থাকলে এমন ঘরোয়া পরিবেশ পেতাম না। তাছাড়া, পুরনো বাড়িতে থাকার আমেজটা অন্যরকম। বাসার মালিক মেসো ও মাসির সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক হয়ে গেছে, হোটেলে থাকলে এই মানুষ দুজনকে পেতাম না, এটা আমাদের বোনাস পাওয়া। 

বাড়িটির সামনে বাগানবিলাস ফুটে ছিল তখন। আমরা যেই ঘরে উঠেছিলাম, তার সিলিং ছিলো নিচু, হলদে রঙের দেয়াল, পেল্লাই দেওয়া আগেকার দিনের জানালা, ছোট কাঠের দরজা। পেছনের দরজা খুললে সামনে খোলামেলা বড় বারান্দা, বারান্দার সামনে মহল্লার পিঁচঢালা পথ। ঘরের ভেতর বাথরুমের ব্যবস্থা ছিল না। সামনের দরজা খুললে সিঁড়ির পাশেই পুরনো দিনের মোজাইক করা বাথরুম, বাথরুমের সামনে ছোট একটা বেসিন। সব মিলিয়ে অন্যরকম ব্যপার।

যাই হোক, থাকার জায়গা পেয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে আমাদের প্রায় মাঝরাত হয়ে গিয়েছিল। রাতে কোনোরকমে রুটি সবজি খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। কলকাতার প্রথম রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, আমি এখন কলকাতার বুকে শুয়ে আছি, এই স্মৃতিটুকু আমার সারাজীবনের সোনালি সঞ্চয় হয়ে থাকবে, এই ভালোলাগা ব্যাখ্যা করা যাবে না কোনোভাবেই!


সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নিলাম। দমদম স্টেশনে নদীয়ার এক মিষ্টি মেয়ে দেখা করল। তারপর আমরা মেট্রোতে করে চলে গেলাম দক্ষিণেশ্বর। আমার প্রথম মেট্রোরেলে চড়ার অভিজ্ঞতা দারুণ ছিল। দক্ষিণেশ্বর স্টেশনটা সুন্দর। আসলে, কলকাতার প্রায় সব স্টেশনই খুব নান্দনিক। দক্ষিণেশ্বর নেমে স্কাই ওয়াক দিয়ে হেঁটে চলে গেলাম দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। বেশ বড় মন্দির চত্বর। খুব বিখ্যাত ও সুন্দর এই মন্দির। অনেক মানুষের সমাগম দেখলাম। মন্দিরের পাশেই গঙ্গা নদী। সেখানে সবাই স্নান করছে। নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। কী সুন্দর শীতল বাতাস নদীর বুক থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর ওপর বড় একটা ব্রীজ; বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রীজের মতো। নদীতে অনেকে মানত করে পয়সা ফেলে যাচ্ছে। সেই পয়সাগুলো আবার চুম্বকের সাহায্যে তুলছে কেউ কেউ। ব্যপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল।

দক্ষিণেশ্বর মন্দির। ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণেশ্বর মন্দির। ছবি : সংগৃহীত


দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে আমরা ফেরিতে করে গেলাম বেলুড় মঠ। কিন্তু আমরা যখন পৌঁছেছি, তখন দুপুরের বিরতিতে মঠ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই আমরা বাসে করে হাওড়া চলে গেলাম। বহুল কাঙ্ক্ষিত হাওড়া ব্রীজ পুরোটা হেঁটে দুবার পাড় হলাম। সুন্দর ভিউর জন্য ফুলবাজার হয়ে গঙ্গার ধারে নেমে হাওড়া ব্রীজের সঙ্গে ছবি তুললাম। তারপর হাওড়া রেল মিউজিয়ামটা দেখলাম। ছোট একটা খোলা চত্বরে মিউজিয়াম; যেখানে রেলের ইতিহাসের জন্ম থেকে আজকের অবস্থান পর্যন্ত সব দেখা ও জানা যায়। হাওড়া জংশনের একটা মিনিয়েচারও আছে সেখানে। সেই মিনিয়েচারের ভেতরেও আবার জাদুঘরের মতো সাজানো গোছানো কিছু সংগ্রহ রয়েছে।

রেল মিউজিয়াম। ছবি : সংগৃহীত

রেল মিউজিয়াম। ছবি : সংগৃহীত


সেখান থেকে আবার আমরা বেলুড় মঠ গেলাম। বেলুড় মঠ মোটামুটি বড় একটা জায়গা। এক চত্বরের ভেতরে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। গঙ্গার কোল ঘেঁষে স্থাপনাগুলো হওয়াতে দারুণ অনুভূতি পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এত সুন্দর লাগে জায়গাটা, মনে হয় গঙ্গার ধারে বসে থাকি কয়েক ঘন্টা। 

বেলুড় মঠ। ছবি : সংগৃহীত

বেলুড় মঠ। ছবি : সংগৃহীত


দক্ষিণেশ্বর মন্দির হোক বা বেলুড় মঠ, এ জায়গাগুলো যতটা না দর্শনীয় স্থান, তারচেয়ে বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষদের তীর্থস্থান। তাই যারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী, তারা এ জায়গাগুলোকে আরও বেশি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন বলেই আমার ধারণা।

নিউমার্কেট। ছবি : সংগৃহীত

নিউমার্কেট। ছবি : সংগৃহীত


বেলুড় মঠ থেকে সন্ধ্যায় আমরা ফিরে এলাম কলকাতায়। এসপ্ল্যানেডে গেলাম। নিউমার্কেট ঘুরে দেখলাম। এদিকে দমদমে এক দিদি অপেক্ষা করছে দেখা করার জন্য। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসপ্ল্যানেড থেকে দমদমে চলে এলাম। দিদি আমাকে বড় একটা পোর্ট্রেট উপহার দিলেন, যেটা তিনি নিজে হাতে এঁকেছেন আমার জন্য। আরও উপহার দিলেন সুকুমার সমগ্র এবং একটা কার্ড। সুকুমার সমগ্রটাও খুব সুন্দর, বইটা হাতে নিলেই শান্তি লাগে। আর কার্ডটা নাকি স্পেশাল চাইল্ডরা বানিয়েছে। ব্যপারটা কিছুটা অবাক করেছে আমাকে, একইসঙ্গে মুগ্ধও। নিতান্তই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পরিচিত হওয়া কোনো মানুষের এমন ভালোবাসা পেলে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। তা যদি হয় অন্য দেশ কিংবা শহরে, তাহলে তো কথাই নেই।

দিদিকে বিদায় দিয়ে হোটেল থেকে রাতের খাবার খেয়ে আমরা বাসায় ঢুকে পড়লাম, আরও একটা দিনের গল্প লিখব বলে...

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   হেঁটে  কলকাতা  ভ্রমণ  পর্যটক  পর্যটন  পশ্চিমবঙ্গ  ভারত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: