কলকাতার পথে পথে

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

কলকাতা এমন একটি শহর, তা একেকজনের কাছে একেকরকম আবেদন নিয়ে ধরা দেয়। কেউ যদি ভালোবাসার দৃষ্টি নিয়ে কলকাতার দিকে তাকায়,

2026-08-06T16:57:53+00:00
2026-08-08T11:00:57+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
কলকাতার পথে পথে
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৫৭ পিএম 
মায়ার শহর কলকাতা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
কলকাতা এমন একটি শহর, তা একেকজনের কাছে একেকরকম আবেদন নিয়ে ধরা দেয়। কেউ যদি ভালোবাসার দৃষ্টি নিয়ে কলকাতার দিকে তাকায়, শহরটি তার কাছে প্রেয়সীর মতোই ধরা দেয়। আবার কেউ যদি এটিকে শুধুমাত্র একটা কৃত্রিম শহর মনে করে, কলকাতা তার কাছে কৃত্রিম হয়েই ধরা দেয়। আমার সৌভাগ্য যে, এ শহর বরাবরই আমার কাছে তুমুল প্রেম নিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছে, যার পরতে পরতে রয়েছে জীবন ও যাপনের নানা আয়োজন।

কলকাতা ইকোপার্ক। ছবি : সংগৃহীত

কলকাতা ইকোপার্ক। ছবি : সংগৃহীত


কলকাতা থাকার জন্য আমরা দমদমের একটা বাসায় উঠেছিলাম। দিন পাঁচেক ছিলাম। এটা কলকাতা ভ্রমণের শেষ দিনের গল্প। ছাইরঙা একটা শাড়ি জড়িয়ে নিলাম গায়ে। আমার পুরো দিনের ভ্রমণসঙ্গী ভারতীয় এক বন্ধু। আজকের প্রথম গন্তব্য কলকাতার নিউটাউন। দমদম থেকে আমরা মাহেন্দ্রতে করে নাগেরবাজার গেলাম। সেখান থেকে বাসে চলে গেলাম ইকোপার্ক।


আকারে পার্কটা বেশ বড়। এটি ভারতের সবচেয়ে বড় পার্ক। পুরোটা একদিনে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা বোধহয় সম্ভব নয়। ইকোপার্কে মোট ৬টি গেট আছে। দর্শনার্থীরা ৪০ রূপি প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে যেকোনও গেইট দিয়েই প্রবেশ করতে পারেন। তবে, ৪ নম্বর গেটের কাছে আছে বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের প্রতিরূপ। তাই আমরা সেই গেইট দিয়ে প্রবেশ করলাম। এখানে দেখতে পাবেন চিনের প্রাচীর, রোমের বিখ্যাত মঞ্চ কলোসিয়াম, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত জিশুমূর্তি, জর্ডানের পেট্রা, মিশরের পিরামিড, ভারতের তাজমহল এবং চিলের রহস্যময় দ্বীপ স্টার আইল্যান্ডের বিভিন্ন ভাস্কর্য। তবে, এগুলো একদম কাছ থেকে দেখার জন্য আলাদা করে টিকিট কাটতে হয়।

৪ নম্বর গেইট দিয়ে ঢুকলে দেখা মেলে এই সপ্তম আশ্চর্যের প্রতিরূপ। ছবি : সংগৃহীত

৪ নম্বর গেইট দিয়ে ঢুকলে দেখা মেলে এই সপ্তম আশ্চর্যের প্রতিরূপ। ছবি : সংগৃহীত


একটা প্রবেশপথ থেকে আরেকটা প্রবেশপথে যেতেই পা ব্যথা হয়ে যায়। হাঁটতে ইচ্ছে না করলে ব্যাটারিচালিত গাড়ি বা টয়ট্রেনে পুরো ইকোপার্কটা চক্কর দিতে পারেন। তার জন্য ২ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলেই ভালো হবে।

পুরো পার্কজুড়ে দেখার মতো আছে অনেককিছু। ট্রি হাউসের মতো বাড়ি আছে। আছে পাখিবিতান, গল্ফ কোর্স, অ্যাম্ফিথিয়েটার, বাটারফ্লাই গার্ডেন, স্কাল্পচার গার্ডেন, বিভিন্ন ফলমূলের বাগান, চা-বাগান, জোড় বাংলো মন্দির, কাচের তৈরি গ্লাস হাউস, কাফে, প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের প্রতিরূপ, রিসোর্ট, জাপানি ফরেস্ট, রবি অরণ্য, আরও কত কী। 


আমরা যেদিন ইকোপার্কে যাই, সেদিন ছিল রবিবার, অর্থাৎ ভারতে ছুটির দিন। তাই প্রচুর মানুষ এসেছিল। ইকোপার্ক সুন্দর, তবে ছুটির দিনে গেলে সেই সৌন্দর্য ভালোভাবে অনুভব করা যায় না। ছুটির দিন বাদে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইকোপার্কে খুব ভালোলাগবে, বিশেষ করে লেকপাড়ের বেঞ্চিতে বসে সন্ধ্যা নামা দেখলে। 

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইকোপার্কে খুব ভালোলাগবে। ছবি : সংগৃহীত

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইকোপার্কে খুব ভালোলাগবে। ছবি : সংগৃহীত


ইকোপার্ক থেকে বাসে করে আমরা চলে যাই মাদার ওয়াক্স মিউজিয়ামে। ইকোপার্ক থেকে দূরত্ব বেশি নয়। মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য নিয়েছিল ২৫০ রুপি। বিখ্যাত সব তারকাদের (শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, রবি ঠাকুর, ম্যারাডোনা ইত্যাদি) মোমের ভাস্কর্য বানিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে। এছাড়া, উপভোগ করার মতো আরও বিভিন্ন জিনিস রয়েছে। তবে, মিউজিয়ামটা ততোটাও বড় নয়। মিউজিয়াম দেখা হয়ে গেলে সেখানের ছাদের ভিউ দেখার সুযোগ আছে। যখন গোধূলি নামছে, তখন আমরা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে এত বেশি ভালোলাগছিল নতুন কলকাতা শহরটা!

মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম। ছবি : সংগৃহীত

মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম। ছবি : সংগৃহীত


মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম থেকে আবার বাসে করে আমরা চলে যাই নারকেলবাগান, রবীন্দ্রতীর্থে। এটাও কাছেই। রবীন্দ্রতীর্থ জায়গাটা খুবই নান্দনিক। এখানে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনী আছে, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত ছবির সংগ্রহশালাও রয়েছে। এছাড়া, এটি একটি আর্কাইভ ও গবেষণা কেন্দ্র। এখানে একটি অডিটোরিয়ামও আছে, যেখানে বিভিন্ন প্রোগ্রাম হয়। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন অডিটোরিয়ামে গানের প্রোগ্রাম চলছিল। রবীন্দ্রনাথের ওপর যেসব ছাত্রছাত্রীরা গবেষণা করেন, তাদের থাকার জন্য ডরমিটরিও রয়েছে। রবীন্দ্রতীর্থের নকশাকারকে শ্রদ্ধা জানাই। নিউটাউনেও রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি রাখার সিদ্ধান্ত যিনি নিয়েছিলেন, তাকেও প্রণাম।

রবীন্দ্রতীর্থ। ছবি : সংগৃহীত

রবীন্দ্রতীর্থ। ছবি : সংগৃহীত


এরপর আমরা যাই ডিএলএফ, নজরুলতীর্থে। নজরুলতীর্থে আছে মিলনায়তন, জাদুঘর, একাডেমি, গ্রন্থাগার, নজরুল গবেষণাকেন্দ্র, আর্কাইভসহ ভারত-বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্র। দুর্ভাগ্যবশত বাস আমাদের ভুল জায়গায় নামিয়ে দেয়। দুই কিলোমিটার হেঁটে, খুঁজে খুঁজে যখন নজরুলতীর্থে পৌঁছাই, তখন আর হাতে বেশি সময় ছিল না। তাই ভেতরে প্রবেশ করিনি। বাইরে থেকে দেখেই চলে এসেছি। ওহ হ্যাঁ, বলে রাখা ভালো যে নিউটাউনে সবকিছুই ওল্ড কলকাতার চেয়ে একটু ব্যয়বহুল, এমনকি যাতায়াত ভাড়াও।

নজরুলতীর্থ। ছবি : সংগৃহীত

নজরুলতীর্থ। ছবি : সংগৃহীত


যাই হোক, এরপর আমরা আবার বাসে করে চলে আসি নাগেরবাজার। সেখান থেকে দমদম। ভ্রমণসঙ্গীকে বিদায় জানিয়ে বাসায় ঢুকে পড়ি। কলকাতায় আমার শেষ রাত নামে ভালোলাগা ও মন কেমনের সমারোহে।

দেখতে দেখতে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো দিন ফুরিয়ে গেল। এখন যাদুর শহর কলকাতা থেকে ফেরার পালা। অনুপমের ‘তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা’র হাঁটা থামিয়ে দিতে হলো এবারের মতো। রবি ঠাকুরের দক্ষিণের বারান্দার আলোটুকু বুকের বাঁ পাশে নিয়ে পরদিন ভোরবেলা দমদম থেকে চলে এলাম হাওড়া স্টেশন। পেছনে ফেলে এলাম ছাতারকলের দোতলা পুরনো বাসা, দমদম জংশন, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউজ, ঘোড়ার গাড়ি, পায়ে টানা রিকশা, হলুদ ট্যাক্সি, সবকিছু। ফেলে এলাম কিছুটা আমাকেও!

হাওড়া স্টেশনে আমার সঙ্গে ৩ ভারতীয় বন্ধু, দুজন সঙ্গেই যাবে শেষ পর্যন্ত, একজন এসেছে বিদায় জানাতে। সে আমাদের বিদায় দিয়ে মেদিনীপুরের ট্রেনে উঠবে, অফিস করবে পৌঁছে। আমরা কলকাতা যাব বলে অনেক কষ্টে ৩ দিন ছুটি ম্যানেজ করেছিল। ট্রেন চলতে শুরু করলো, সে দাঁড়িয়ে রইলো স্টেশনে; যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের ট্রেনটা চোখের আড়াল হয়।

কলকাতা ছেড়ে আসতে বুকের ভেতর শূন্য শূন্য লাগছিল। কলকাতায় যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে কিংবা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যাদের সঙ্গে দেখা হয়নি, সবার কথা মনে পড়ছিল। ছাতারকলে যেই বাসাটায় ছিলাম, সেই বাসার মেসো বিদায় জানিয়ে বলেছিলেন, ‘যোগাযোগ রেখো’। আমি জানি, বেশিরভাগ মানুষের সঙ্গেই যোগাযোগ ম্লান হয়ে যায়। যোগাযোগ থাকবে কিনা জানি না, তবে হৃদয়ের সংযোগ থাকবে নিশ্চয়ই। 


ট্রেনে মাত্র ৩০ রুপি দিয়ে চারটা লাল আটার রুটি ও ডিম ভুনা কিনলাম, সকালের নাশতার জন্য। ট্রেনে মানুষ খুব কম ছিলো। আরাম আয়েশ করে এসেছি পুরোটা পথ। প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথের (কলকাতা থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর) ভাড়া ছিল মাত্র ১৬০ রুপি। ভারতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্রান্সপোর্ট খরচ যথেষ্ট কম। এ ব্যপারটা ভালোলেগেছে।

যাই হোক, পুরোটা পথ গল্প করতে করতে এলাম আমরা। গানও শুনেছি জার্নির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। অনেককিছু খেয়েছিও। প্রতিটা স্টেশনে যখন ট্রেন থামে, হকাররা বিভিন্ন খাবার নিয়ে ট্রেনে উঠেন। এসব পথের খাবার খেতে বেশ লাগে। 

গোটা একটা দিন শেষে সন্ধ্যাবেলায় আমরা বালুরঘাট পৌঁছালাম। স্টেশন থেকে টোটো নিলাম ত্রিমোহিনী পর্যন্ত। ওদিকে বালুরঘাট বাসস্ট্যান্ডে আরেক ভারতীয় বন্ধু অপেক্ষা করছিল আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। টোটো থামিয়ে ওর সঙ্গে কথা বললাম কিছুক্ষণ। ও আমাকে উপহার দিলো। ওকে বিদায় জানিয়ে ফের যাত্রা শুরু করলাম ত্রিমোহিনীর দিকে।

ত্রিমোহিনী পৌঁছে শুরু হলো আমার বাংলাদেশে ফেরার তোড়জোড়। একদিন বিশ্রাম নিয়েই হিলি বর্ডার দিয়ে ফিরে এলাম বাংলাদেশে। চোখের তারায়, মনের অন্দরমহলে আঁকা রইলো ভ্রমণের অনিন্দ্য সুন্দর দিনগুলো...

সময়ের আলো/মহু

  বিষয়:   কলকাতা  পথে  ভ্রমণ  পর্যটন  পশ্চিমবঙ্গ  ভারত  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: