আনন্দ ফোয়ারার শহর কলকাতা

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

কলকাতার যাদুময়ী ক্ষমতা আছে, একবার এই শহরের মায়ায় পড়লে সেই মায়া কাটানো যায় না। এটি এত সমৃদ্ধ শহর, এত দর্শনীয়

2026-07-26T18:43:23+00:00
2026-07-26T20:08:45+00:00
 
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
ফিচার
আনন্দ ফোয়ারার শহর কলকাতা
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪৩ পিএম  আপডেট: ২৬.০৭.২০২৬ ৮:০৮ পিএম
যাদুর শহর কলকাতা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
কলকাতার যাদুময়ী ক্ষমতা আছে, একবার এই শহরের মায়ায় পড়লে সেই মায়া কাটানো যায় না। এটি এত সমৃদ্ধ শহর, এত দর্শনীয় স্থান সেখানে, একবার ভ্রমণে পুরো কলকাতা দেখা সম্ভব নয়। তবুও মুগ্ধতা নিয়ে একদিনে কী কী দেখলাম কলকাতায়, সেই গল্প শোনাব আজ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পরিচিত হওয়া কলকাতার এক শুভাকাঙ্ক্ষী আমি তার শহরে এসেছি জেনে, সারাদিনের জন্য একটা প্রাইভেট কার রিজার্ভ করে পাঠালেন। যেন শহরটা ভালোভাবে আরাম করে ঘুরে দেখতে পারি। এটা নাকি তার পক্ষ থেকে উপহার। সকাল সকাল আমি আর ভারতীয় দুজন বন্ধু যাত্রা শুরু করলাম। একটু পর রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে কচুরি ও লুচি দিয়ে নাশতা করলাম। এই স্বাদ অপূর্ব। কলকাতা গেলে, এই অমৃত খাওয়া মিস করবেন না।


নাশতা শেষে আমরা প্রথমে গেলাম স্বামী বিবেকানন্দ মিউজিয়ামে। যদিও মূল বাড়িটা এখন আর নেই, তবে আগের রূপেই সংস্কার করা হয়েছে। পুরো বাড়িটাই এখন মিউজিয়াম। ভালোইলাগবে ঘুরে দেখতে। মিউজিয়ামটির অবস্থান ১০৫ বিবেকানন্দ রোড, কলকাতা। যারা তাকে পছন্দ করেন, ঘুরে আসতে পারেন সেখানে।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলকাতা। ছবি : সংগৃহীত

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলকাতা। ছবি : সংগৃহীত


এরপর গেলাম রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিসৌধ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। ময়দানের পাশেই মেমোরিয়ালটির অবস্থান। কলকাতার যা কিছু আইকনিক, তার ভেতর ভিক্টোরিয়া অন্যতম। বিশাল এক প্রাসাদ, যার নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯২১ সালে। ১১ বছর সময় লেগেছিল এটি নির্মাণ করতে। অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, আগাগোড়া শ্বেতপাথর দিয়ে এত সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করা কীভাবে সম্ভব! যেসব শ্রমিকরা তাদের কঠোর পরিশ্রমে এই অমূল্য স্থাপনা তৈরি করে রেখে গেছেন, তাদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা রইল। মেমোরিয়ালটির ভেতর জাদুঘর রয়েছে। দেশ ও বয়স ভেদে প্রবেশমূল্য ভিন্ন ভিন্ন।

পরবর্তী গন্তব্য কলকাতার লালদিঘীতে অবস্থিত সেন্ট জন্স চার্চ। এটি কলকাতায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা প্রথম স্থাপিত ভবনগুলির একটি; যার নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৭৮৭ সালে। সেন্ট জন্স চার্চের জন্য জমিটি প্রদান করেছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নব কিসেন বাহাদুর। চার্চটা দেখতে সুন্দর। সমাধিও আছে ভেতরে। প্রবেশ মূল্য নেই, তবে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৮০ রুপি করে দিতে হয়। 

সেন্ট জন্স চার্চ। ছবি : সংগৃহীত

সেন্ট জন্স চার্চ। ছবি : সংগৃহীত


তারপর চলে গেলাম কলকাতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কলেজ স্ট্রিটে। সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের জন্য এটি স্বপ্নের জায়গা। কলেজ স্ট্রিটের পথে হাঁটার ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের। সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল সেদিন। সেখানে ঢাকার নীলক্ষেত কিংবা বাংলাবাজারের মতো অনেক নতুন, পুরনো বইয়ের দোকান। পুরো স্ট্রিটটা বইয়ের গন্ধে মৌ মৌ করে।

কলেজ স্ট্রিটেই অবস্থিত বিখ্যাত কফি হাউজ। মান্না দের কফি হাউজ সম্পর্কে কে না জানে। সবাই চায়, কলকাতা গেলে একবারের জন্য হলেও যেন সেখানে গিয়ে এক কাপ কফি খেতে পারে। আমার সেই ইচ্ছে পূরণ হলো তো বটেই, আরও দারুণ কিছু বাড়তি পাওয়া হলো। ভারতীয় কয়েকজন বন্ধু আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলো সেখানে। একসঙ্গে আড়াই ঘণ্টা সময় কাটালাম আমরা। জীবন মানুষকে কতকিছু দিতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ সেই কফি হাউজের দুপুর। কফি হাউজের আড্ডায় আমাদের আর কখনও দেখা হবে কিনা জানি না, তবে যে যেখানে থাকুক, খুব সুন্দর থাকুক। ওহ হ্যাঁ, কফি হাউজে আমরা কফি, চিকেন কাটলেট আর চাওমিন খেয়েছিলাম। মোটামুটি ভালোই লেগেছিল খেতে।

প্রিন্সেপ ঘাটে নদীতে ঘোরার জন্য রয়েছে রঙিন নৌকা। ছবি : সংগৃহীত

প্রিন্সেপ ঘাটে নদীতে ঘোরার জন্য রয়েছে রঙিন নৌকা। ছবি : সংগৃহীত


এরপর গেলাম প্রিন্সেপ ঘাট ও হুগলী সেতু। ঘাট ও তৎসংলগ্ন পার্কে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। সেখানে ভাড়ায় সুন্দর সুন্দর রঙিন নৌকা পাওয়া যায়, ঘুরলে খুব ভালোলাগে।। এছাড়া, ঘাট বা পার্ক থেকে ব্রীজসহ নদীর দৃশ্যটাও উপভোগ করার মতো।

প্রিন্সেপ ঘাট থেকে রওনা হলাম চৌরঙ্গী রোডের সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রালের দিকে। এটা অনেক বড় এবং আকর্ষণীয় একটি ক্যাথিড্রাল; যার নিমার্ণকাজ শেষ হয় ১৮৪৭ সালে। ১৮৯৭ এবং ১৯৩৪ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে একটি সংশোধিত নকশা অনুসারে গির্জাটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। গির্জাটি পুরোটা সাদা রঙের, তাই আরও শুভ্র সুন্দর লাগে। প্রবেশ ফি মাত্র ১০ রুপি। পাশেই বিড়লা তারামন্ডল। এটা বাংলাদেশের নভো থিয়েটারের মতো। এখানে আমাদের সঙ্গে দেখা করল আরেক ভারতীয় বন্ধু। তারপর ওকে সঙ্গে নিয়েই গেলাম নন্দনে।

সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল। ছবি : সংগৃহীত

সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল। ছবি : সংগৃহীত


রবীন্দ্র সদন ও নন্দন একই চত্বরে অবস্থিত। সেই চত্বরে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ভবন রয়েছে। রবীন্দ্র সদনের ভেতর মিউজিয়াম আছে। আর সকল সিনেমাপ্রেমী মানুষেরা সিনেমা দেখেন নন্দনে। সময়ের অভাবে আমাদের সিনেমা দেখা হলো না। 

পথে যেতে যেতে আরও কিছু দর্শনীয় জায়গা দেখেছি সারাদিনে। যেমন- স্টার থিয়েটার। এটা খুব জনপ্রিয় এবং পুরনো থিয়েটার। ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে এই থিয়েটারের সম্পর্ক চিরকালীন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’ উপন্যাস পড়লে থিয়েটারটির ব্যপারে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। আরও দেখলাম মহাজাতি সদন, সেন্ট টমাস গির্জা, গড়ের মাঠ, ইডেন গার্ডেন পার্ক ইত্যাদি। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গটা দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আর্মি পারমিশন লাগে বলে দেখতে পারিনি। এবার গড়ের মাঠেও বসা হয়নি। ভবিষ্যতে কোনো এক বিকেলে সেখানে বসে সময় কাটাবার আশা রেখেছি।


যাই হোক, নন্দন থেকে আমরা চলে এলাম দমদমে, যেহেতু কলকাতায় অস্থায়ী নিবাসে উঠেছি এখানেই। ড্রাইভার দাদাকে বিদায় দিলাম। তখন জাদুর শহরে আলো ঝলমলে রাত। দমদম স্টেশন আর আমাদের বাসার মাঝামাঝি একটা জায়গায় বইমেলা হচ্ছিল। বইপ্রেমী মানুষ হিসেবে সেটা দেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলাম না।

দমদমে বাণিজ্য মেলার মতো আরেকটা মেলা হচ্ছিল। যেই শুভাকাঙ্ক্ষী গাড়ি রিজার্ভ করে পাঠিয়েছিলেন, তার বাসার কাছেই সেই মেলা। তিনি আমাদের মেলায় নিয়ে গেলেন। একসঙ্গে ঘুরে দেখলাম। চা খেলাম। তারপর মেলা থেকে বের হয়ে একটা বিরিয়ানির দোকানে নিয়ে গেলেন তিনি। সেখানে খেয়েদেয়ে, তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা ফিরে এলাম বাসায়। কলকাতার বুকে সুন্দর একটি দিনের সমাপ্তিসহ স্বপ্নের মতো কয়েকটা দিন জমা হলো স্মৃতির পাতায়...

সময়ের আলো/মহু





  বিষয়:   কলকাতা  ভ্রমণ  পর্যটন  পর্যটক  শহর  আনন্দ  ভারত  পশ্চিমবঙ্গ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: