কলকাতা যেন মায়ানগরী

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

কখনও জোড়াসাকো ঠাকুরবাড়ি গেলে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে যাব, এমনটা ভেবে রাখা ছিল অনেক আগে থেকেই। এবারের মায়ানগরী কলকাতা

2026-07-29T17:02:26+00:00
2026-07-29T17:26:01+00:00
 
  বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
কলকাতা যেন মায়ানগরী
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৫:০২ পিএম  আপডেট: ২৯.০৭.২০২৬ ৫:২৬ পিএম
মায়ানগরী কলকাতা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
কখনও জোড়াসাকো ঠাকুরবাড়ি গেলে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে যাব, এমনটা ভেবে রাখা ছিল অনেক আগে থেকেই। এবারের মায়ানগরী কলকাতা ভ্রমণে তাই বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সময় তেমন একটা শাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। একদিনে বেশ কিছু জায়গা ঘোরার পরিকল্পনা রেখেছিলাম। সেই তালিকায় ঠাকুরবাড়ি ছিল সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্থান।

মাদার তেরেসার সমাধি। ছবি : সংগৃহীত

মাদার তেরেসার সমাধি। ছবি : সংগৃহীত


সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। আমার সঙ্গে ভারতীয় দুই বন্ধু। প্রথমে গেলাম কলকাতার বোস রোডে মাদার তেরেসার বাসভবনে। চারতলা ভবন, দেয়ালে মার্বেল পাথরে খোদাই করে লেখা ‘MISSIONARIES OF CHARITY’। বাঁ দিকে গলির ভেতর ঢুকতেই চোখে পড়ল মাদার তেরেসার মূর্তি। সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা ‘The Mother House’। অন্যরকম একটা শান্ত সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করে সেখানে। সমাধির কাছে গিয়ে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। কেউ কেউ সেখানে প্রার্থনা করছেন।

এ ঘরটিতে থাকতেন মাদার তেরেসা। ছবি : সংগৃহীত

এ ঘরটিতে থাকতেন মাদার তেরেসা। ছবি : সংগৃহীত


মাদার তেরেসার মিউজিয়াম বা লাইব্রেরি কক্ষ ঘুরে দেখলাম। এই কক্ষে তার ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো সুন্দর করে সাজানো আছে, স্মৃতিবিজড়িত অনেক মুহূর্তের ছবি আছে। এমনকি তার জীবনী নিয়ে লেখা বইও আছে লাইব্রেরিটিতে। তিনি দোতলার যেই ছোট্ট ঘরটায় ঘুমাতেন, সাদামাটা জীবনযাপন করতেন, সেই ঘরটাও দেখলাম। একটা সিঙ্গেল খাট আর টেবিল-চেয়ার ছাড়া কিছু নেই। ঘরটিতে প্রবেশ করার সুযোগ নেই দর্শনার্থীদের; জানালা দিয়ে দেখতে হয়। আবারও মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এলো। ওহ হ্যাঁ, এখানে কোনো প্রবেশমূল্য নেই।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ছবি : সংগৃহীত

ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ছবি : সংগৃহীত


এরপর গেলাম আলিপুরে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি দেখতে। আরেক ভারতীয় বন্ধু এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সেখানে। ২৫ লাখেরও বেশি বই সংরক্ষিত আছে লাইব্রেরিটিতে। মেম্বারশিপ না থাকার দরুন ভেতরে প্রবেশ করতে পারলাম না। ন্যাশনাল লাইব্রেরি বেশ সুন্দর এবং সমৃদ্ধ একটা জায়গা। যেতে পারলে ভালোলাগত, কিন্তু বাইরে থেকে দেখেই চলে আসতে হলো।

ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। ছবি : সংগৃহীত

ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। ছবি : সংগৃহীত


কালবিলম্ব না করে চলে গেলাম চৌরঙ্গীতে, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম দেখতে। ১৮১৪ সালে নির্মিত এই মিউজিয়াম বেশ বড় এবং আয়তাকার সাদা রঙের দোতলা ভবন। মিউজিয়ামে প্রচুর সংগ্রহ, দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয়। এতকিছু সংগ্রহ করা কীভাবে সম্ভব হলো, সেও এক আশ্চর্যজনক ব্যপার! এখানে গেলে অবশ্যই সময় নিয়ে যাবেন। বয়স ও দেশ ভেদে এখানের টিকিট মূল্য ভিন্ন ভিন্ন। মিউজিয়ামের ভেতরেই খাবার হোটেল আছে। লাঞ্চটা এখানেই সেরে নিলাম। খাবারের মান ভালো এবং দামও হাতের নাগালে। 

মার্বেল প্যালেস। ছবি : সংগৃহীত

মার্বেল প্যালেস। ছবি : সংগৃহীত


পরবর্তী গন্তব্য উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের মার্বেল প্যালেস। ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম থেকে মেট্রোতে করে আমরা চলে গেলাম গিরিশপার্ক। সেখানে নেমে পায়ে হেঁটে প্যালেসে গেলাম। বেশ বড় একটা সুন্দর প্রাসাদ। প্রাসাদের সামনে খোলামেলা বড় বাগান। বাড়িটি ১৮৩৫ সালে ধনী বাঙালি বণিক রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক নির্মাণ করেছিলেন। তিনি শৈল্পিক নিদর্শন সংগ্রহ করতে ভালোবাসতেন। মার্বেল প্যালেসে অনেক পশ্চিমা ভাস্কর্য, ভিক্টোরিয়ান আসবাবের টুকরো, ইউরোপীয় এবং ভারতীয় শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম এবং অন্যান্য নিদর্শন রয়েছে। আলংকারিক জিনিসগুলির মধ্যে বড় ঝাড়বাতি, ঘড়ি, ভূমি থেকে সিলিং পর্যন্ত আয়না, কলস, এরকম আরও অনেক জিনিস রয়েছে। বাড়িটিতে এখনো তার বংশধররা বসবাস করেন বলে জানা গেছে। সঙ্গত কারণে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি পাইনি। তাই ন্যাশনাল লাইব্রেরির মতো এটাও বাইরে থেকে দেখেই চলে আসতে হয়েছে।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। ছবি : সংগৃহীত

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। ছবি : সংগৃহীত


এরপর গেলাম জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে নীলমণি ঠাকুর বাড়িটি নির্মাণ করেন। নীলমণি ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র, রামমণি ঠাকুরের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুর। ১৮৬১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণও করেন এখানে।


পায়ে টানা রিকশা কলকাতার ঐতিহ্য। একজন মানুষ এভাবে পায়ে হেঁটে যাত্রী বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, আধুনিক যুগে এসেও এমন দৃশ্য অমানবিক। কিন্তু একবার হলেও তাতে চড়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, জীবনে একবারই চড়ব, খুব অল্প পথ যাব এবং চালক যা ভাড়া চাইবে তা-ই কিংবা তারচেয়ে বেশি দিব, কোনো দরদাম করব না। মার্বেল প্যালেস থেকে ঠাকুরবাড়ির দূরত্ব মাত্র আধা কিলোমিটার। তাই এই পথটুকুই পায়ে টানা রিকশায় চড়ার উপযুক্ত মনে করে চড়ে বসলাম। ভাড়া নিলো ৫০ রুপি।

ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ যেন আজও জীবন্ত। ছবি : সংগৃহীত

ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ যেন আজও জীবন্ত। ছবি : সংগৃহীত


জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি আমার কাছে তীর্থস্থানের মতো। এখানে যেতে পারাটা আমার সৌভাগ্যের ব্যপার। ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে আমার অনুভূতি কেমন ছিল, তা লিখতে গেলে বড় একটা রচনা হয়ে যাবে। ওতটা বলছি না। যারা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসেন, তারা জানেন ঠাকুরবাড়ি তাদের জন্য কী!

দোতলা থেকে জাদুঘর শুরু। এখানে রয়েছে ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, স্মৃতিবিজড়িত ছবি। এখানে গেলে দেখতে পাবেন, রবীন্দ্রনাথ কোন কক্ষে জন্মেছিলেন কিংবা কোন কক্ষে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। দেখতে পাবেন মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘর, রবি বাবু ও মৃণালিনীর শয়নকক্ষ, খাবার ঘর, বিখ্যাত সেই দক্ষিণের বারান্দা এবং আরও অনেককিছু। পুরো বাড়ি যখন ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকবেন, আপনার কানে ভেসে আসবে রবীন্দ্রসঙ্গীত; যা অন্যরকম আবহ তৈরি করে।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল। ছবি : সংগৃহীত

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল। ছবি : সংগৃহীত


ঠাকুরবাড়ির সন্ধ্যার লাইটিং শো টা দেখে মনে হয়েছে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা সন্ধ্যা কাটালাম। বারবার এখানে যেতে চাই। লাইটিং শোয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে শুরু করে রবীন্দ্র জীবন, মৃত্যু পুরোটাই অসাধারণভাবে দেখানো হয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুটা যখন তুলে ধরা হয়, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল থেকে অদ্ভুত এক আলো এসে মূল গেইট অবধি ছড়িয়ে পড়ে, তখন আপনার চোখ জলে ভিজে যাবেই।

এখানে গেলে হাতে অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা সময় নিয়ে যেতে হবে। এখানের প্রবেশমূল্যও দেশ ও বয়স ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। লাইটিং শো দেখার জন্য আলাদা করে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। ভেতরে ছবি তোলার জন্যেও আবার আলাদা টিকিট নিতে হয়। যদিও ছবি তোলার ক্ষেত্রে টিকিট সিস্টেম ব্যপারটা আমার ভালোলাগেনি। অন্দরমহলে ছবি তোলা যায় না, কেবলমাত্র ভবনের সামনে ছবি তোলার জন্য টিকিট সিস্টেমের কোনো মানে হয় না আসলে। জানিয়ে রাখা ভালো, সোম থেকে শুক্র সপ্তাহের ৫ দিন, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা এবং শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এই ঠাকুরবাড়ি। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ।

ঠাকুরবাড়ি থেকে আমরা চলে গেলাম এসপ্ল্যানেডে। নিউমার্কেটে ঘোরাঘুরি করলাম। শ্রীলেদার্স থেকে কেনাকাটা করে এসপ্ল্যানেড থেকে দমদম এলাম। তারপর আবার চলে গেলাম উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায়। তখন কলকাতা শহরে রাত। তবুও বিখ্যাত দাদা-বৌদির বিরিয়ানি খাওয়ানোর জন্য এক ভারতীয় বন্ধু আমাদের নিয়ে গেল সেখানে। ভারত বা কলকাতার রেল ব্যবস্থা খুব ভালো বলেই রাতের বেলাতেও কলকাতা থেকে আরেক জেলায় গিয়ে ডিনার করার কথা ভাবা যায়।

বিরিয়ানিটা বেশ ভালোই ছিলো। ডিনার শেষ করে আবার চলে এলাম দমদমে; যেখানে আমাদের কলকাতা বাসের অস্থায়ী ঠিকানা। কিছু ইচ্ছে পূরণের মধ্য দিয়ে একটা পায়ের তলায় সর্ষের মতো সুন্দর দিন এভাবেই শেষ হলো। রাত বাড়ার পর কলকাতার বুকে আরও একটা নতুন দিন কাটানোর পরিকল্পনা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম...

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   কলকাতা  মায়ানগরী  পশ্চিমবঙ্গ  ভারত  ভ্রমণ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: