দুই শতাধিক বছর আগের ঘটনা। ১৮১৬ সালের গ্রীষ্মকাল। ক্যালেন্ডার বলছে জুন মাস, কিন্তু প্রকৃতি যেন শীতের দখলে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সূর্যের দেখা নেই, আকাশ ঢেকে আছে ধূসর মেঘে। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়েও মানুষ মোটা কাপড় পরে ঠান্ডা সামলাচ্ছে। কোথাও তুষারপাত, কোথাও বরফে ঢেকে যাচ্ছে মাঠ। ফসল নষ্ট হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে খাদ্যসংকট। ইতিহাসে এই বছরটি পরিচিত হয়ে যায় ‘গ্রীষ্মহীন বছর’ নামে।
কিন্তু কেন এমন হয়েছিল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে ১৮১৫ সালের এপ্রিল মাসে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট তামবোরা আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে। গত প্রায় দুই হাজার বছরের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী এই বিস্ফোরণে বিপুল পরিমাণ ছাই, ধুলো ও সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই কণাগুলো পৃথিবীজুড়ে সূর্যালোকের ওপর এক ধরনের আবরণ তৈরি করে। ফলে সূর্যের আলো স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারেনি এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা দেয় ১৮১৬ সালে।
সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত আসে কৃষিতে। জুন ও জুলাই মাসেও তুষারপাত হওয়ায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু এলাকায় গম, ভুট্টা, আলু ও অন্যান্য ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও ফসল পাকার আগেই জমে যায়, কোথাও বরফের নিচে চাপা পড়ে।
অল্প সময়ের মধ্যেই খাদ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে খাদ্যের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। সুইজারল্যান্ডে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে সরকার দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
এই জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব এশিয়াতেও পড়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষার স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয়। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা দেখা দেয়। কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়। গবেষকদের একাংশের মতে, এই অস্বাভাবিক আবহাওয়াই উপমহাদেশে কলেরার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
অদ্ভুত হলেও সত্য, এই দুর্যোগ সাহিত্যেও নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ১৮১৬ সালের সেই ঠান্ডা ও বৃষ্টিভেজা গ্রীষ্মে সুইজারল্যান্ডের লেক জেনেভার পাশে একটি ভিলায় বাস করতেন কবি লর্ড বায়রন, পার্সি বিশি শেলি এবং তরুণ লেখিকা মেরি গডউইন।
দীর্ঘ সময় ঘরবন্দি থাকার কারণে তারা ভৌতিক গল্প লেখার একটি প্রতিযোগিতা শুরু করেন। সেই আড্ডা থেকেই জন্ম নেয় মেরি শেলির বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। একই সময়ে চিকিৎসক জন পোলিডোরি লেখেন ‘দ্য ভ্যাম্পায়ার’, যা আধুনিক ভ্যাম্পায়ার সাহিত্যের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সংকট প্রযুক্তির ইতিহাসেও প্রভাব ফেলেছিল। ওটসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘোড়ার খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং অসংখ্য ঘোড়া মারা যায়। তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল ঘোড়া। এই পরিস্থিতিতে ১৮১৭ সালে জার্মান উদ্ভাবক কার্ল ড্রেইস দুই চাকার একটি কাঠের বাহন তৈরি করেন, যা পরে আধুনিক সাইকেলের প্রথম রূপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
তখন মানুষের বসবাসের ধরনও বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের বহু কৃষক ফসলহানির কারণে পশ্চিমাঞ্চলের নতুন এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হন। ওহাইও, ইন্ডিয়ানা ও আশপাশের অঞ্চলে নতুন বসতি গড়ে ওঠে। ইতিহাসে এটি পরে ‘পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণ’ নামে পরিচিত হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, তামবোরার মতো অগ্ন্যুৎপাত খুবই বিরল হলেও অসম্ভব নয়। ১৯৯১ সালে ফিলিপাইনের মাউন্ট পিনাতুবোর অগ্ন্যুৎপাতের পরও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কিছুটা কমে গিয়েছিল, যদিও তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী ছিল।
ভবিষ্যতে যদি তামবোরার মতো আরেকটি বড় অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, তাহলে তা বৈশ্বিক জলবায়ু, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সময়ের আলো/এমকে