বন উজাড় করে বসতি গড়ে মানুষ, অনুপ্রবেশের দায়ে প্রাণ হারায় বন্যপ্রাণী

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

নগরের কোলাহল এড়িয়ে নিবিড়ভাবে কান পাতলেই হারানো কোনো বনের গভীর থেকে ভেসে আসে এক অদৃশ্য আর্তনাদ। যে গাছের ছায়ায় জন্মেছিল,

2026-08-07T20:01:41+00:00
2026-08-07T20:01:41+00:00
 
  বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
বন উজাড় করে বসতি গড়ে মানুষ, অনুপ্রবেশের দায়ে প্রাণ হারায় বন্যপ্রাণী
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০১ পিএম 
বাংলাদেশে বিলুপ্তির ঝুঁকির মুখে রয়েছে বুনোহাতি। ছবি : বিবিসি/গেটি ইমেজ
নগরের কোলাহল এড়িয়ে নিবিড়ভাবে কান পাতলেই হারানো কোনো বনের গভীর থেকে ভেসে আসে এক অদৃশ্য আর্তনাদ। যে গাছের ছায়ায় জন্মেছিল, যে অরণ্যের পথ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলেছে হাতি, হরিণ, বানর কিংবা বনবিড়াল, সেই আশ্রয় আজ মানুষের দখলে। মানুষের আয়েশ মেটাতে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে বন, ভেঙে ফেলা হচ্ছে পাহাড়। ফলে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির চিরচেনা মানচিত্র। আর নিজের হারানো ঘরের সন্ধানে কোনো প্রাণী যখন মানুষের বসতিতে এসে পড়ে, তখন তাকেই বলা হয় ‘অনুপ্রবেশকারী’।

প্রশ্ন থেকে যায়, যে প্রাণীর ঘর মানুষ কেড়ে নিয়েছে, সে কি সত্যিই অনুপ্রবেশকারী?

সভ্যতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের প্রয়োজনের জন্য প্রকৃতিকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে বন্যপ্রাণী। খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসা হাতি, গাছ হারানো বানর, আশ্রয় হারানো সাপ কিংবা বনবিড়ালকে অনেক সময় মানুষের রোষের শিকার হতে হয়। কখনো পিটিয়ে, কখনো বিষ প্রয়োগ করে, আবার কখনো ফাঁদ পেতে হত্যা করা হয় তাদের।

পরিবেশকর্মী প্যাট্রিক এডওয়ার্ডসের একটি মন্তব্য যেন এই সংকটের নির্মম চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘আমরা পশুদের আবাস কেড়ে নিয়ে নিজেদের বাসস্থান তৈরি করি, পরে তাদেরকেই অনুপ্রবেশের দায়ে হত্যা করি।’

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় বারবার। বন উজাড় আর মানুষের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে সংকুচিত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। ফলে বাড়ছে মানুষ ও প্রাণীর সংঘাত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো বন্যপ্রাণী হত্যা করে এই সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। একটি প্রাণীকে সরিয়ে দিলে সেই জায়গা পূরণ করে অন্য কোনো প্রাণী। তাই সমস্যার শিকড় রয়ে যায় আগের মতোই।

তাদের মতে, বন্যপ্রাণী রক্ষার প্রথম শর্ত হলো তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা। বনাঞ্চলের পাশে অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। খাদ্যবর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে প্রাণীকে ক্ষতি না করে এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে বন্যপ্রাণীর আচরণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের বনাঞ্চলে প্রতিদিনই কমছে প্রাণের সংখ্যা। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে সড়কে গাড়িচাপায় প্রতিবছর গড়ে ৫৫টি প্রাণী মারা যায়। ২০১২ সাল থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৫০ হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে বাঘ, সিংহ, কুমিরসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির প্রাণী ও পাখি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া প্রাণীর সংখ্যা অবৈধ পাচারের প্রকৃত চিত্রের খুব সামান্য অংশ।

প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ব মনে করিয়ে দিতে প্রতিবছর ৩ মার্চ পালিত হয় বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিনটিকে ঘোষণা করে। পরের বছর থেকে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। কিন্তু সচেতনতার আয়োজনের পরও থামেনি বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বন উজাড় হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের তথ্য বলছে, ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। গত এক শতকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে হারিয়ে গেছে ৩১ প্রজাতির প্রাণী।


একসময় সুন্দরবনের বাঘ ছিল বাংলাদেশের গর্ব ও প্রকৃতির শক্তির প্রতীক। কয়েক বছর বাঘ হত্যার ঘটনা কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বেড়েছে বন্যপ্রাণী পাচারের তৎপরতা। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসের মধ্যে দুটি বাঘ হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। উদ্ধার হয়েছে বাঘের মরদেহ ও চামড়া। পাশাপাশি নবীনগর, ফেনী, বান্দরবান ও সাতক্ষীরা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিরল প্রজাতির বানর, উল্লুক ও হনুমান।

বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে তক্ষকও। একসময় গ্রামের ঘরবাড়িতে সহজেই দেখা মিলত এই প্রাণীর। কিন্তু নানা গুজব ও অবৈধ বাণিজ্যের কারণে এখন এটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। কোটি টাকায় বিক্রির মিথ্যা প্রচারণাকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা তক্ষক শিকার করছে।

আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হয় একটি পথ হিসেবে। সড়ক, নৌ ও আকাশপথে পাচার হয় বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট কাজ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এই অপরাধ।

শুধু পাচার নয়, অবৈধ শিকারও প্রকৃতির জন্য বড় হুমকি। বিনোদনের নামে পাখি শিকার, পরিযায়ী পাখি হত্যা, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার ধ্বংস করছে অসংখ্য প্রাণ। কোথাও বন্দুকের গুলি, কোথাও বিষ মেশানো খাবার, আবার কোথাও ফাঁদে আটকে নিভে যাচ্ছে জীবনের ছোট ছোট আলো।

মানুষ ভুলে যাচ্ছে, বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি অসংখ্য প্রাণের ঘর। সেই ঘর ধ্বংস করে যদি মানুষ নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, তবে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।

বন্যপ্রাণী আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তারা এই পৃথিবীর সহযাত্রী। তাদের বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু কয়েকটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং রক্ষা করা পৃথিবীর নিজস্ব ভারসাম্য। কারণ শেষ পর্যন্ত বন হারালে শুধু বন্যপ্রাণী নয়, হারাবে মানুষও।


সময়ের আলো/এমকে
  বিষয়:   বন  বন্যপ্রাণী  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: