মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এসব চাহিদা পূরণের প্রত্যাশাই সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চিন্তার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নাগালের মধ্যে রাখার প্রত্যাশা থাকে জনগণের মধ্যে। এ কারণেই বাজেট ঘোষণার দিন নিত্যপণ্যের মূল্য ও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা শোনার জন্য সব শ্রেণির মানুষই অধীর আগ্রহ নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে ছিলেন। জাতীয় সংসদে গতকাল বেলা ৩টা ২ মিনিটে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের সূচনায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর স্পিকারের অনুমতিসাপেক্ষে অর্থমন্ত্রী ৩টা ৭ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন। এ সময় তার পরনে ছিল ছাই রঙের স্যুট ও নীল টাই। বাজেট উপস্থাপনের সময় তিনি মাঝেমধ্যে বিরতি নেন, বিশেষ করে আসর ও মাগরিবের নামাজের সময় কিছু সময়ের জন্য অধিবেশন স্থগিত থাকে। এর আগে জাতীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সংসদের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদের নিজ কক্ষে বাজেট বিল স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়কাল তুলনামূলকভাবে কম। এ অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার আগেই ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরিতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বৃহস্পতিবার ছিল এই নবীন সরকারের জন্য এক ধরনের ‘মাইলফলক মুহূর্ত’- যেদিন নতুন অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা উপস্থাপন করা হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই বলেন, সরকার মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চায়। কীভাবে এই স্বাচ্ছন্দ্য বাস্তবায়ন করা হবে, তার একটি রূপরেখা বাজেটের বিভিন্ন অংশে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান অর্থনীতিতে নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। তবে একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে নতুন বাজেট অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের উৎস কর কমানোর সিদ্ধান্ত জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকার ইতিমধ্যে পহেলা বৈশাখে কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এ কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করে ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫ হাজার কৃষকের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা বছরে একবার করে নির্দিষ্ট আর্থিক সহায়তা পাবেন, যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর আগে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা কৃষক সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দেশে মূল্যস্ফীতি একটি বড় অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি অর্জন সম্ভব হলে তা অর্থনীতিতে একটি বড় স্বস্তির বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাজেটে বিভিন্ন খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বাজেটে একাধিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে তৃতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে ইচ্ছুকদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওষুধ শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন খাতে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কিডনি ও ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের চিকিৎসাব্যয় কিছুটা হলেও কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতেও বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিটি ঘর ও অফিসে বিস্তৃত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। মোবাইল ও ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশও এই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। তরুণদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তরুণসমাজ এ বাজেট একটি সম্ভাবনাময় দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখছে।
কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব নিরসনের জন্য সরকার একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’- এই স্লোগান ভিত্তি করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বন্ধ কল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের অগ্রগতি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
খেলাধুলা খাতেও বাজেটে ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সিদের জন্য রেলযাত্রা ফ্রি এবং মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ছাড়ের প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করেছে।
কর ব্যবস্থাপনায়ও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় একটি কাঠামোগত সীমারেখা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও বাজেটে একাধিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ৬৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো, ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ১১৩টি পণ্যের নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপ থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজেট ব্যবসাবান্ধব হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন সংশ্লিষ্টরা।
/কেএইচও