দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনীতি পুনর্গঠন ও সংস্কারের একটি রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করে এটিকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক যাত্রার বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় নতুনত্ব হলো অবকাঠামো-কেন্দ্রিক ব্যয়ের পরিবর্তে মানবসম্পদ, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতিতে ‘ডিরেগুলেশন’, ‘ইকুইটি-ভিত্তিক বিনিয়োগ, ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’, ‘স্পোর্টস ইকোনমি’ এবং ‘ব্লু ইকোনমি’র মতো নতুন ধারণা যুক্ত হয়েছে। এই বাজেটে চিরাচরিত প্রথার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক বহুমুখী নতুনত্বের সমাহার ঘটানো হয়েছে।
সরকার বলছে, এসব খাতকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় এনে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করা হবে। এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় নতুনত্ব হলো এর অর্থনৈতিক দর্শন। অর্থমন্ত্রী একে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব না বলে একটি ‘পথ-নকশা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাজেটে ‘৩-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন এন্ড রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, যা প্রথম এক বছরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পরবর্তী তিন বছরে উত্তরণ এবং আগামী পাঁচ বছরে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করবে। এ ছাড়া ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির বদলে বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গত এক দশকের বাজেটগুলোতে বড় অবকাঠামো প্রকল্প প্রাধান্য পেলেও এবারের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতকে উন্নয়ন ব্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। সরকার ধাপে ধাপে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যও ঘোষণা করেছে।
এবারের বাজেটের অন্যতম আলোচিত নতুনত্ব শিক্ষা খাতে। সরকার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা জাপানি, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি ও ফরাসি বা জার্মান শেখানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী তৃতীয় ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে নতুনত্বের অংশ হিসেবে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে আধুনিক স্বাস্থ্য ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে ‘ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেম’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য এবারের বাজেটে বড় সুখবর হলো ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগামী ৫ বছরের একটি নির্দিষ্ট কর কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা করদাতাদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও নিশ্চয়তা তৈরি করবে। এ ছাড়া বাজেটে সবচেয়ে চমকপ্রদ নতুনত্ব হলো চাল, ডাল, গম, আলু, মাছ, মাংসসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এর ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করার পাশাপাশি স্টার্ট-আপ ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ও কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
নারীদের জন্য বাজেটে প্রবর্তিত হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, যার মাধ্যমে পরিবারের প্রধান নারী সদস্য মাসে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি সহায়তা পাবেন। এ ছাড়া কর্মজীবী নারীদের জন্য চালু করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত ‘পিঙ্ক বাস সার্ভিস’। বয়স্ক নাগরিকদের (৬৫ বছর ) জন্য রেল ভ্রমণে ১০০ শতাংশ এবং মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সবুজ অর্থনীতি : পরিবেশ রক্ষায় ‘সবুজ বিপ্লব’-এর লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সৌর বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রিক যানবাহনকে জনপ্রিয় করতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর ও শুল্ক সুবিধা বজায় রাখা হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আধুনিক কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার : সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসা সহজ করতে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এবারের বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার উচ্চাভিলাষী সংকল্প।
সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি এবং নীল অর্থনীতির মতো নতুন নতুন খাতগুলোকে মূলধারায় নিয়ে আসার এই চেষ্টা বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।