বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে বিএনপি সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, রাজস্ব আহরণ সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের বিকাশকে প্রধান কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় বলেন, একটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সরকার আগামী আট বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। সেই অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যকে অর্থনীতির ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সরকার মনে করছে, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, রফতানি এবং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, মধ্যমেয়াদে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মতে, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের কর আহরণের সক্ষমতা এখনও অনেক কম। ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বড় অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে রাজস্ব কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সে কারণে এবারের বাজেটে ‘ইনভেস্টমেন্ট-ড্রিভেন গ্রোথ’ বা বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশকে আগামী কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং সেবা খাতকে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে ৪০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার: দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতা কাটিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার।
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিব্যবস্থা চালু, করপোরেট সুশাসন জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে ঋণ কেলেঙ্কারি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কিছু ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় সরকার পুনর্গঠন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে অর্থমন্ত্রী জানান, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনর্মূলধনিকরণ এবং ব্যবস্থাপনা সংস্কারের জন্য চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে এটি সরকারের অন্যতম বড় আর্থিক হস্তক্ষেপ।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে গুরুত্ব : বাজেটে প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং খাতে আধুনিক ‘রিস্ক-বেজড সুপারভিশন’ বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য, ঋণঝুঁকি, তারল্য পরিস্থিতি এবং পরিচালন ঝুঁকি নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অ্যামচেম বাজেটে ভারসাম্য থাকলেও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশে কর্মরত মার্কিন ব্যবসায়ীদের সংগঠন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)।
বৃহস্পতিবার বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায়। সংগঠনটি বলেছে, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
অ্যামচেমের মতে, সরকার আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা ইতিবাচক। সংগঠনটি বলেছে, জিডিপির ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ সমপরিমাণ বাজেট ঘাটতি তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও গ্রহণযোগ্য।