যুবসমাজ একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আজকের যুবকরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও সভ্যতার নির্মাতা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সময়ে আমাদের যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকের ভয়াল থাবার শিকার হচ্ছে। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না; বরং তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে মাদকাসক্তি আজ একটি বৈশ্বিক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি ও চরিত্র সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। এ কারণেই ইসলাম সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
ইসলামি শরিয়তে মাদকাসক্তি কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়, বরং এটি একটি মারাত্মক গুনাহ বা পাপ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মাদকের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী শরগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ। তাই তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’ (সুরা মায়িদাহ : ৯০)। এই আয়াতে মাদককে সরাসরি ‘রিজস’ বা অপবিত্র বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা শয়তানের কর্ম। ‘ফাস্তাজিনুবু’ বা ‘বেঁচে থাকো’ নির্দেশনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মাদক থেকে কেবল দূরে থাকা নয়, বরং তার আশপাশে না যাওয়ারও শিক্ষা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহতেও মাদক নিয়ে কোনো শৈথিল্য নেই। তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু হারাম’ (সহীহ মুসলিম)। অতএব, আধুনিক যুগের ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, আইস বা যে নামেই মাদক আসুক না কেন, তা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আরও পড়ুন
বর্তমানে প্রচলিত নেশাজাতীয় দ্রব্যগুলো- হেরোইন, ফেনসিডিল, মরফিন, পেথেড্রিন, এলএসডি, সিসা, কোকেন, গাঁজা, তাড়ি, নানা ব্র্যান্ডের দেশি-বিদেশি মদ, আফিম, ইয়াবা, মারিজুয়ানা, রেকটিফাইড স্পিরিট, আইকা গাম ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ; যার দ্বারা যুব-তরুণ সমাজ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। এই নেশাজাত দ্রব্য পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মোতাবেক এসব নেশাদায়ক দ্রব্যসহ আরও যেসব জিনিস গ্রহণ করলে মানুষ নেশায় আসক্ত হয়, তা গ্রহণ করা হারাম। এতে কবিরা গুনাহ হয়। যার গুনাহ খালেছ নিয়তে তওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে ১০টি বিষয়ে উপদেশ প্রদান করেছেন, (তন্মধ্যে একটি হলো) কখনো শরাব তথা মদ পান করবে না। কেননা, তা সব ধরনের অশ্লীল কর্মের উৎস। (আহমদ)। তামাকজাত দ্রব্যের (বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, তামাকপাতা, গুল ইত্যাদি) নিকোটিন মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের সংস্পর্শে এলে নেশার সৃষ্টি করে, অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। সে জন্য এসবে কেউ আসক্ত হলে সে তা সহজে ছাড়তে পারে না। তা ছাড়া তামাকজাত নানা দ্রব্য গ্রহণের কারণে ফুসফুসের নানা রোগ, ক্যানসার, হার্টের বিভিন্ন জটিলতাসহ স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা জীবনবিধ্বংসী ও বিপুল পরিমাণে অর্থের অপচয়কারী। তাই বর্তমান সময়ে অধিকাংশ আলেমের মতে, এসব মাদকদ্রব্য তথা নেশা গ্রহণ করা বৈধ নয়। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘প্রতিটি নেশাদার বস্তুই মাদক আর সব মাদকদ্রব্যই হারাম’ (মুসলিম, মিশকাত)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা মদ্যপান করবে না। কেননা এটা সব মন্দের চাবিকাঠি।’ (ইবনে মাজা)।
মাদকের নেশার ভয়াবহতা সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘ব্যভিচারে লিপ্ত থাকা অবস্থায় ব্যভিচারীর ঈমান থাকে না, মদ্যপান করার সময় মদ্যপানকারীর ঈমান থাকে না এবং চোর চৌর্যবৃত্তি করার সময় তার ঈমান থাকে না (বুখারি ও মুসলিম)। তা ছাড়া মেরাজের রাতে নবী (সা.)-কে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি দেখানো হয়েছিল। সেখানে মাদক তথা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণকারীদেরও শাস্তি দেখানো হয়েছে। সেখানে তিনি লক্ষ করেন যে, নেশাগ্রস্ত লোকেরা জাহান্নামিদের শরীর থেকে নির্গত দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পুঁজ পান করছে। (বুখারি ও মুসলিম)। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী, যা কিছু মস্তিষ্কের সংস্পর্শে এসে জ্ঞান-বুদ্ধিকে বিপর্যস্ত ও নেশাগ্রস্ত করে তোলে তা-ই হারাম। চাই তা তরল হোক, বায়বীয় হোক কিংবা কঠিন পদার্থই হোক না কেন।
মাদক একটি নীরব ঘাতক। এটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনই ধ্বংস করে না; বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সর্বোপরি কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শ অনুসরণ করে আল্লাহভীতির জীবন গড়ে তুলতে পারলেই মাদকমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। মহান আল্লাহ মানব সম্প্রদায়কে মরণঘাতী নেশার হাত থেকে পরিত্রাণ দান করে সুন্দর এই পৃথিবীর বুকে সুস্থ-সবল জীবনযাপন করার তৌফিক দান করুন।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
এএডি/