কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর রাতটির কথা ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা। পর্তুগালকে বিদায় করে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নাম লেখানোর পর মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত ও মারাকেশের সড়কগুলো রূপ নিয়েছিল উৎসবের নগরীতে। পুরো দেশ মেতেছিল এক অবিস্মরণীয় রাত জাগার উল্লাসে।
চার বছর পর উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির সামনে আবারও এসেছে তেমন এক ঐতিহাসিক ক্ষণ। ফুটবল ইতিহাসের সফলতম দল ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তারা। বিশ্বমঞ্চে সেলেসাওদের হারানোর এমন সুযোগ যে-কোনো দলের জন্যই স্বপ্নের মতো।
আকস্মিক সাফল্য নয়, মরক্কোর উত্থান সুপরিকল্পিত
কাতারে মরক্কোর সেই রূপকথার যাত্রা যে স্রেফ ভাগ্যের জোরে ছিল না, গত কয়েক বছরে মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রমাণ দিয়েছে তারা। সেবার সেমিফাইনালের টিকিট কাটার পথে তারা হারিয়েছিল বেলজিয়াম ও স্পেনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে। কাকতালীয়ভাবে, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছে মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল।
চলতি বছর আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (আফকন) ট্রফি জয়কে কেন্দ্র করে বেশ নাটকীয়তার জন্ম দেয় দলটি। রাবাতের ফাইনালে ভিএআর প্রযুক্তিতে গোল বাতিলের জেরে মরক্কোর প্রতিপক্ষ সেনেগাল প্রথমার্ধে মাঠ বর্জন করে। পরে তারা খেলায় ফিরে মরক্কোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও, দুই মাস পর শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সেনেগালের শিরোপা বাতিল করে আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ফলে ৫০ বছর পর আফ্রিকার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মরক্কোর মাথায় উঠলেও, এমন এক বিতর্কিত উপায়ে ট্রফি জয় হয়তো দলটির কাম্য ছিল না।
ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড ও ইনজুরির ধাক্কা
বিশ্বকাপের মঞ্চে অবশ্য নিজেদের শক্তিতেই আধিপত্য বিস্তার করতে চায় মরক্কো। বর্তমান দলটিতে রয়েছে একঝাঁক বিশ্বমানের তারকা। পিএসজির হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী আশরাফ হাকিমি এখন দলটির প্রধান চালিকাশক্তি। রিয়াল মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজের অন্তর্ভুক্তি তাদের আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করেছে। আর গোলপোস্ট সামলানোর দায়িত্বে বরাবরের মতোই আছেন বিশ্বস্ত গোলরক্ষক ইয়াসিন বনু।
তবে নতুন কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির জন্য মূল ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইনজুরি। রক্ষণভাগের প্রধান সেনানি নায়েফ আগের্দ এবং ফরোয়ার্ড আবদে এজ্জালজুলি চোটের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ায় টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছে দলটি।
অবকাঠামো ও ফুটবল কূটনীতির নতুন হাব
মরক্কোর ফুটবলের এই এক্সপ্রেস গতিতে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। ইউরোপে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা আশরাফ হাকিমি বা দিয়াজের মতো প্রবাসী ফুটবলারদের খুঁজে বের করে এক পতাকার নিচে আনার দূরদর্শী মিশন অনেক আগেই শুরু করেছিল দেশটি। এর ফলও এসেছে হাতেনাতে; গত বছর ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে মরক্কো। সেই সফল যুব দলের কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবিই এখন সিনিয়র জাতীয় দলের ডাগআউট সামলাচ্ছেন, যেখানে কাতার বিশ্বকাপের পর বিদায় নিয়েছেন ওয়ালিদ রেগুরাই।
মরক্কোর রাজপরিবারের কাছে ফুটবল এখন বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের একটি অন্যতম 'সফট পাওয়ার'। আফ্রিকায় ফিফার আঞ্চলিক সদর দপ্তর নিজেদের দেশে নিয়ে আসা এবং ২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হওয়া—সব মিলিয়ে মরক্কো এখন আফ্রিকান ফুটবলের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দেশটিতে চলছে বিশাল যজ্ঞ। কাসাব্লাঙ্কার বেনস্লিমানে নির্মিত হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার ধারণক্ষমতার অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম, যা ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের মূল দাবিদার। এছাড়া প্রধান প্রধান শহরগুলোর স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।
তবে কোটি ডলারের অবকাঠামো ছাপিয়ে ফুটবলবিশ্ব মরক্কোকে মনে রেখেছে তাদের সাহসী ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের জন্য। আর শৈল্পিক ফুটবলের আসল প্রতিভূ ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নেমে মরক্কো যে তাদের সেই চেনা ও নান্দনিক রূপেরই পুনরাবৃত্তি করতে চাইবে, তা বলাই বাহুল্য।
সময়ের আলো/জেডি