বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মোট ৬টি মামলা করেছে দুদক।
দুদকের তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের মার্চে গণমাধ্যমে ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ এবং ৩ এপ্রিল ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই তার সম্পদের উৎস ও জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়।
এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ দুদককে নির্দেশ দেন- দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে। একই দিন দুদক জানায়, তারা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে তার সম্পদের নানা তথ্য ও জীবনযাত্রার বিবরণ।
বিলাসবহুল জীবনযাপন ও সম্পদের বিবরণ :
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী রাজধানীর গুলশানের র্যানকন টাওয়ারে চারটি ফ্ল্যাট একত্র করে বেনজীর দম্পতি একটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট তৈরি করেন। সেখানে সুইমিংপুল, মিনি থিয়েটার রুম, অতিথি বিনোদন কক্ষসহ আধুনিক সুবিধা ছিল। দুদকের তথ্যমতে, পুরো ফ্ল্যাটে ১৯টি ফ্রিজ এবং প্রায় ১০০ টন এসি ছিল।
পাশাপাশি উন্নত মানের আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীও ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে এসব সম্পদ নিলামে তোলা হয়।
নিলাম কমিটির সভাপতি ছিলেন দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক। সদস্য হিসেবে ছিলেন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের একজন প্রতিনিধি, বস্ত্র অধিদফতরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধি এবং ইস্পাত প্রকৌশল অধিদফতরের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি। সদস্য সচিব ছিলেন দুদকের উপপরিচালক (সম্পদ ব্যবস্থাপনা)।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী গুলশানের ওই ফ্ল্যাট থেকে মোট ২৪৬টি আইটেম জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল- ১২২টি শার্ট, ২৬৬টি প্যান্ট, ৩০টি ব্লেজার, ৮টি স্যুট, ৭২২টি টি-শার্ট, ২২৪টি পাঞ্জাবি, ৪৭টি পায়জামা, ৮৮ জোড়া স্যান্ডেল, ৩৫ জোড়া কেডস, ৩৮ জোড়া জুতা, ৪৯৪টি শাড়ি, ২৫০ সেট থ্রিপিস, ৪৯৬টি সালোয়ার-কামিজ, ৬৫টি ব্লাউজ, ২১২টি জামা, ৫৬টি জ্যাকেট, ১০৯টি বেডশিট, ৭৫টি লেডিস ভ্যানিটি ব্যাগ, ৬২২টি লেডিস টপস, ১১টি সোয়েটার (পুরুষ), ৩৪টি সোয়েটার (লেডিস), ৩৫৫টি লেডিস প্যান্ট, ২৮টি লেডিস টি-শার্ট, ৫৮টি নাইট ড্রেস, ৩৪৭টি ওড়না, ৮৯টি শাল-চাদর, ১৩২টি শীতের জামা, ১৬টি লেহেঙ্গা, ৩৪টি সানগ্লাস ও ৬৭টি ট্রাউজার।
এ ছাড়া ড্রয়িংরুম, বৈঠকখানা, থিয়েটার রুম, কিচেন, মাস্টার বেডসহ বিভিন্ন কক্ষের ব্যবহৃত মূল্যবান সামগ্রীও তালিকাভুক্ত করা হয়।
রিসোর্ট ও স্থাবর সম্পদ :
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামে প্রায় ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর তিনি ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’ গড়ে তোলেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডেমরা-ইছাপুরা সড়কের পাশে ২৪ কাঠা জমিতে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি, যা ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে পরিচিত।
এর আগে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির অধীনে থাকা ৫৫ শতাংশ জলাশয় ভরাট করে দখলের অভিযোগ ওঠে। পরে ভরাট করা ওই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কেনা হয়। বিদেশি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এসব স্থাপনা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
মামলা, সম্পদ ও আর্থিক অভিযোগ :
বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে দুদকে চারটি মামলা রয়েছে। এতে মোট ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেন। তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সম্পদ ও ১৬ কোটি ১ লাখ টাকা তথ্য গোপন করেন। বড় মেয়ের নামে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। মেজ মেয়ের নামে রয়েছে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ। এ ছাড়া ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, ৩টি বিও হিসাব ও ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র জব্দের আদেশ দেয় আদালত।
তদন্ত, রেড নোটিস ও গ্রেফতার :
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে তদন্তে গতি আসে এবং এক ডজনেরও বেশি মামলা হয়। একই সময়ে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগেও তদন্ত শুরু হয়। ২০২৫ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি হয় এবং পরে ১২ জুন তাকে দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়।
নিরাপত্তা, পাসপোর্ট ও দেশত্যাগ :
অবসরের পরও তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা পান। তবে ২০২৪ সালের ৪ মে নতুন পাসপোর্ট নিয়ে তিনি পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করেন। এ সময় বিপুল অর্থ ও স্বর্ণালংকার বহনের অভিযোগও ওঠে। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলাও রয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে ৬টি মামলা বিচারাধীন, এর মধ্যে একটি মামলার চার্জশিট দাখিল হয়েছে। বাকি ৫টি মামলা তদন্তাধীন।
সময়ের আলো/জেডি