হেপাটাইটিস বি এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সরাসরি লিভারকে আক্রান্ত করে। বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষ এই ভাইরাস বহন করছেন, অথচ তাদের অনেকেই জানেন না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। এ কারণেই হেপাটাইটিস ‘বি’ কে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
দৈনন্দিন চেম্বারে এমন অনেক রোগী আসেন, যারা সামান্য জন্ডিসের লক্ষণ নিয়ে এসে পরীক্ষা করার পর জানতে পারেন তারা হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। মুহূর্তেই তাদের চোখে-মুখে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। অনেকেই একে লিভারের ক্যানসার ভেবে বসেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগে হেপাটাইটিস ‘বি’ কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে একে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লক্ষণ
হেপাটাইটিস ‘বি’ এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগটি দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে। একজন ব্যক্তি বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তার লিভারে ধীরে ধীরে ক্ষতি হতে থাকে। অনেক সময় রোগ ধরা পড়ে তখন, যখন লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে গেছে। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ যা দেখা দিতে পারে:-
*অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা।
*হালকা জ্বর ও শরীর বা জয়েন্টে ব্যথা।
*খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
*প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ হওয়া এবং চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)।
*পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে মৃদু ব্যথা।
যেভাবে ছড়ায় : কিছু ভুল ধারণা ও বাস্তবতা
আমাদের সমাজে হেপাটাইটিস ‘বি’ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন এটি ছোঁয়াচে রোগ বা একসঙ্গে খেলে ছড়ায়।
*হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত ও শরীরের কিছু তরলের মাধ্যমে ছড়ায়।
*অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ, একই সুচ বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার এবং আক্রান্ত মা থেকে নবজাতকের মধ্যে এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
*এ ছাড়া অপরিষ্কার চিকিৎসা সরঞ্জাম, ট্যাটু বা পিয়ার্সিংয়ের মাধ্যমেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হেপাটাইটিস ‘বি’ সাধারণ সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে ছড়ায় না। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, হাত মেলানো, আলিঙ্গন, একই অফিসে কাজ করা, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ানোর কোনো প্রমাণ নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী সামাজিক বৈষম্য ও মানসিক চাপে ভোগেন।
আমার চেম্বারে অনেক রোগীকে বলতে শুনি, হেপাটাইটিস ‘বি’ ধরা পড়ার পর তারা আত্মীয়স্বজন বা সহকর্মীদের কাছে বিষয়টি জানাতে ভয় পান। কেউ কেউ মনে করেন, সমাজ তাদের এড়িয়ে চলবে। বাস্তবে রোগটির চেয়ে অনেক সময় মানুষের ভুল ধারণা রোগীদের বেশি কষ্ট দেয়। তাই হেপাটাইটিস ‘বি’ নিয়ে অযথা ভয় নয়, বরং সঠিক তথ্য জানা জরুরি।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ
হেপাটাইটিস ‘বি’ থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। আর এর জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি-
*শরীরে রক্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই তা হেপাটাইটিস ‘বি’সহ অন্যান্য স্ক্রিনিং করা আছে কি না নিশ্চিত হোন।
*প্রতিবার ইনজেকশন নেওয়ার সময় নতুন সুঁই ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করুন।
*সেলুনে চুল কাটার বা শেভ করার সময় সর্বদা নতুন ব্লেড ব্যবহার করতে বাধ্য করুন।
*হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো এর ভ্যাকসিন বা টিকা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ৩ বা ৪ ডোজের এই টিকা সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করলে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
*স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ডায়ালাইসিস রোগী, আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য এবং যাদের রক্তের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেশি, তাদের টিকা নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত রোগীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বিশেষ কোনো খাবার খেলেই রোগ ভালো হয়ে যাবে। বাস্তবে রোগীদের পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ এবং সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করা উচিত। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়াই ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। যারা স্থূলতায় ভুগছেন, তাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত চর্বি লিভারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অ্যালকোহল লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে।
হেপাটাইটিস ‘বি’ ধরা পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সময়মতো পরীক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় টিকাদান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন কাটাতে পারেন। তাই ভয় বা লজ্জা নয়, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
লেখক : গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
সময়ের আলো/জেডআই