২৪ বছর আগের এক স্মৃতি আবারও ফিরে আসছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচে। ২০০২ সালে তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফরাসিদের হারিয়ে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল সেনেগাল। সেই ম্যাচের স্মৃতি আজও দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
বিশ্বকাপের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফ্রান্সের মতো ধারাবাহিক দল খুব কমই আছে। ২০১৮ সালে শিরোপা জয়ের পর ২০২২ সালে আবারও ফাইনালে উঠেছিল লে ব্লু। যদিও শেষ পর্যন্ত রানার্সআপ হতে হয়েছে, তবু তাদের পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে কেন ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা অন্যতম শিরোপা প্রত্যাশী। তবে নতুন অভিযানের শুরুতেই সামনে এমন এক প্রতিপক্ষ, যারা অতীতে তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
২০০২ বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই পাপা বুবা দিওপের গোলে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল সেনেগাল। সেই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল ছিল না, বরং আফ্রিকান ফুটবলের জন্যও ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাই এবারের লড়াই শুধুই তিন পয়েন্টের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্নও।
বর্তমানে অবশ্য দুই দলের অবস্থান ভিন্ন বাস্তবতায়। ফ্রান্স বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি, আর সেনেগাল আফ্রিকার সেরাদের একটি। ২০২১ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের মাধ্যমে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’। ফলে ইতিহাস ও বর্তমান দুই দিক থেকেই ম্যাচটি বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফ্রান্সের জন্য এটি বিশেষ একটি বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্ট শেষে দায়িত্ব ছাড়বেন কোচ দিদিয়ের দেশম। খেলোয়াড় ও কোচ দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র জীবিত ব্যক্তি তিনি। তার অধীনেই ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে ফ্রান্স এবং ২০২২ সালে ফাইনাল খেলেছে। বিদায়ি মঞ্চে আরেকটি শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামছে তার দল।
বাছাইপর্বে মাত্র দুই পয়েন্ট হারিয়ে টানা অষ্টমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় ফ্রান্স। যদিও প্রস্তুতি ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে হেরেছিল, পরে উত্তর আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে ছন্দে ফেরে তারা। শেষ ১০ ম্যাচের ৯টিতেই একাধিক গোল করেছে দলটি, যা তাদের আক্রমণভাগের শক্তির প্রমাণ।
অন্যদিকে সেনেগালও অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব শেষ করেছে। এটি তাদের টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ। কোচ পাপে থিয়াওয়ের দল সাম্প্রতিক সময়ে পেরু ও গাম্বিয়াকে হারালেও শেষ দুই প্রস্তুতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হার এবং সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে। তবে রক্ষণে তারা যথেষ্ট শক্তিশালী; শেষ সাত ম্যাচে পাঁচটি ক্লিনশিট রেখেছে।
তারকা খেলোয়াড়ের দিক থেকেও ম্যাচটি আলাদা মাত্রা পাচ্ছে। একদিকে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে, অন্যদিকে সেনেগালের সবচেয়ে বড় ভরসা সাদিও মানে। জাতীয় দলের হয়ে যৌথভাবে ৫৬ গোল করা এমবাপে এখন অলিভিয়ের জিরুকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শের অপেক্ষায়। গতি, ফিনিশিং ও বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে তিনি ফরাসি আক্রমণের প্রধান অস্ত্র।
অন্যদিকে চোটের কারণে ২০২২ বিশ্বকাপ মিস করা সাদিও মানে এবার পুরোপুরি ফিট। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা এই ফরোয়ার্ড এখনও সেনেগালের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তারকা। তার সঙ্গে আক্রমণে থাকবেন নিকোলাস জ্যাকসন ও ইসমাইলা সার, আর মাঝমাঠে অভিজ্ঞ ইদ্রিসা গানা গেই। হেড-টু-হেড পরিসংখ্যানে দুই দলের সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াই সেই ২০০২ বিশ্বকাপেই। ফলে ইতিহাস সেনেগালকে অনুপ্রেরণা দিলেও বর্তমান শক্তিমত্তা, স্কোয়াডের গভীরতা ও অভিজ্ঞতায় স্পষ্টভাবেই এগিয়ে ফ্রান্স। তবু আফ্রিকার দলটির গতি, শারীরিক সামর্থ্য ও পাল্টা আক্রমণের দক্ষতা ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে এটি শুধু ফ্রান্সের নতুন বিশ্বকাপ অভিযানের সূচনা নয়, বরং অতীত ও বর্তমানের এক আকর্ষণীয় সংঘর্ষ। আর সেই লড়াইয়ে ফুটবলপ্রেমীদের বিশেষ নজর থাকবে এমবাপে ও মানের দ্বৈরথে।
আরবিএন