বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। পারিবারিক পরিসর, বন্ধুদের গোলটেবিলের আড্ডা থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান সর্বত্র ফুটবল নিয়ে নানান আলোচনা। কিন্তু প্রতি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশাল এক অর্থনীতির বাজার তৈরি হয়, যা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।
বিশ্বকাপ এমন একটি আয়োজন, যা একসঙ্গে পর্যটন, পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তি, খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প এবং বিনোদন খাতকে সক্রিয় করে তোলে। মাঠে যে ম্যাচটি ৯০ মিনিটে শেষ হয়ে যায়, তার অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে থাকে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই দিক থেকে আরও ব্যতিক্রমী। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে, ম্যাচের সংখ্যাও আগের যেকোনও আসরের তুলনায় বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আসরের আয়োজক একক কোনো দেশ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো- ৩টি দেশ মিলিতভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগে থেকেই এর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যায়। একটি শহর যখন বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত হয়, তখন থেকেই সেখানে প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়। স্টেডিয়াম সংস্কার, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা অবকাঠামো তৈরি- সবকিছুর পেছনে বিনিয়োগ হয় বিপুল অর্থ। এসব প্রকল্পে যুক্ত হয় হাজার হাজার শ্রমিক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও বিভিন্ন সেবাখাতের কর্মী।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে পর্যটন খাতে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো সমর্থক তাদের প্রিয় দলকে সমর্থন দিতে আয়োজক দেশগুলোতে ভ্রমণ করেন। তখন সেই সমর্থক বা দর্শকের নানাবিধ ব্যয়ের সঙ্গে অনেক খাত জড়িয়ে থাকে।
ধরা যাক, আর্জেন্টিনার একজন সমর্থক নিউইয়র্কে এসে নিজের দলের খেলা দেখছেন। তিনি হয়ত ৫ দিন থাকবেন। এই ৫ দিন তিনি হোটেলে থাকবেন, স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করবেন, রেস্টুরেন্টে খাবেন, পর্যটন কেন্দ্র ঘুরবেন, কেনাকাটা করবেন। একজন দর্শকের এই ব্যক্তিগত ব্যয়ই স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নতুন আয় তৈরি করে। যখন এমন দর্শকের সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছে যায়, তখন এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি হয়।
বিশ্বকাপ এলে অনেক লাভবান হয় হোটেল ব্যবসায়ীরা। আয়োজক শহরগুলোতে কক্ষের চাহিদা এত দ্রুত বাড়ে যে, অনেক সময় কয়েক মাস আগেই অধিকাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কক্ষভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বড় আন্তর্জাতিক হোটেলগুলোর পাশাপাশি লাভবান হয় ছোট মোটেল, গেস্টহাউস এবং স্বল্পমেয়াদি আবাসন ভাড়ার প্ল্যাটফর্মগুলোও। অনেক শহরে স্থানীয় বাসিন্দারাও বিশ্বকাপের মৌসুমে নিজেদের বাড়ির অতিরিক্ত কক্ষ ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করার সুযোগ পান।
পরিবহন খাতও বিশ্বকাপের মৌসুমে ব্যাপক লাভবান হয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের বিশেষত্ব হলো ম্যাচগুলো ৩টি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে সমর্থকদের শুধু একটি শহরে নয়, একাধিক শহর এবং কখনও কখনও একাধিক দেশে ভ্রমণ করতে হবে। বিশ্বকাপ চলাকালে কিছু জনপ্রিয় রুটে যাত্রীর চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিমান সংস্থা, রেলপথ, বাস সার্ভিস, ট্যাক্সি কোম্পানি এবং রাইড-শেয়ারিং সেবাগুলোর জন্য এটি বিশাল বাণিজ্যিক সুযোগ।
বিশ্বকাপ অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভোক্তা সংস্কৃতি। ফুটবল সমর্থকেরা পছন্দের দলের জার্সি পরিধান করে থাকেন। কোনো দল ভালো খেললে বা কোনো তারকা খেলোয়াড় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলে তার জার্সির বিক্রি হঠাৎ করেই বেড়ে যেতে পারে। জার্সির পাশাপাশি পতাকা, স্কার্ফ, ক্যাপ, ব্যানার, পোস্টার, স্মারক- সব মিলিয়ে তৈরি হয় বহু বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাজার।
বিশ্বকাপের এই অর্থনৈতিক ছোঁয়া লাগে ছোট ব্যবসাগুলোতেও। ম্যাচের দিন একটি ছোট কফিশপে শত শত নতুন গ্রাহক আসতে পারে। রাস্তার খাবারের বিক্রেতারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্বাভাবিক সময়ের কয়েক দিনের সমান বিক্রি করতে পারেন। স্থানীয় গাইড, ফটোগ্রাফার, ট্যাক্সিচালক, স্যুভেনির বিক্রেতা- সবার জন্য বিশ্বকাপ একটি দারুণ অর্থনৈতিক সুযোগ।
বিশ্বকাপের প্রভাব কখনও কখনও সুদূরপ্রসারী। এটি একটি শহরের আন্তর্জাতিক পরিচিতি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করে। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমে আয়োজক শহরগুলোকে দেখেন। অনেক পর্যটক প্রথমবার কোনো শহরের নাম শোনেন বিশ্বকাপের মাধ্যমে। পরবর্তী বছরগুলোতে সেই শহরে পর্যটক বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বিশ্বকাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ এক মাসের টুর্নামেন্টের সুফল দীর্ঘ সময় পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে বিশ্বকাপের অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। আগে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কেন্দ্র ছিল স্টেডিয়াম ও সম্প্রচার। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কনটেন্ট নির্মাতা, অনলাইন বিজ্ঞাপন, ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানি। একটি ভাইরাল ভিডিও, একটি মিম বা একটি জনপ্রিয় বিশ্লেষণাত্মক পোস্টও লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে।
বিশ্বকাপের এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহের প্রভাব বাংলাদেশের মতো দেশেও দেখা যায়। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে না, কিন্তু বিশ্বকাপের আবেগে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম সক্রিয় দর্শকগোষ্ঠীর অংশ। বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় জার্সির বাজার জমে ওঠে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ডের পতাকা বিক্রি বাড়ে। ইলেকট্রনিক্স দোকানে টেলিভিশন বিক্রি বাড়ে। অনলাইন উদ্যোক্তারা ফুটবলভিত্তিক পণ্য বিক্রি করে বাড়তি আয় করেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বকাপকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরি করেও অনেকে অর্থ উপার্জন করেন। অর্থাৎ বিশ্বকাপের এই অর্থনীতি শুধু আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক।
বিশ্বকাপে হয়ত শেষ পর্যন্ত একটি দল ট্রফি জেতে। কিন্তু এই আয়োজন সারা বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করে, অনেকের জীবন বদলে প্রভাব রাখে। বিশ্বকাপ অর্থনীতির অংশ হয়ে কোথাও না কোথাও তারাও জিতে যায়।
/মহু