বিশ্বকাপে পর্তুগালের গল্প মানেই ইউসেবিও থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া স্বপ্নের গল্প। ১৯৬৬ সালে ইউসেবিওর হাত ধরে বিশ্বকাপের আলোচনায় উঠে আসা দলটি এখনও খুঁজছে সেই কাক্সিক্ষত শিরোপা। আর গত দুই দশক ধরে সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে আছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা এই মহাতারকা আরও একবার নেতৃত্ব দেবেন পর্তুগালকে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের অভিযান শুরু করতে বুধবার হিউস্টনে ডিআর কঙ্গোর মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। গ্রুপ ‘কে’-এর অন্য দুই দল কলম্বিয়া ও উজবেকিস্তান। অন্যদিকে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা ডিআর কঙ্গো শুরুতেই চমক দেখানোর লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে সামনে রেখে এবারও শিরোপার স্বপ্ন দেখছে পর্তুগাল। কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে গত কয়েক বছরে দলটি আরও আক্রমণাত্মক ও আধুনিক ফুটবল খেলছে। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলা তারকায় ঠাসা স্কোয়াড নিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবেই উত্তর আমেরিকায় এসেছে তারা।
ফিফা র্যাঙ্কিংইয়েও পর্তুগাল বিশ্বের শীর্ষ ৫-এ অবস্থান করছে। বাছাইপর্বে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে তারা। বাছাইয়ে মাত্র ছয় ম্যাচে ২০ গোল করার পাশাপাশি আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৯-১ গোলের বিশাল জয় তাদের আক্রমণভাগের সামর্থ্যরে প্রমাণ। প্রস্তুতি ম্যাচেও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে মার্তিনেজের দল। শেষ পাঁচ ম্যাচে চারটি জয় পেয়েছে তারা।
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্যই তাদের আক্রমণভাগ। রোনালদোর পাশাপাশি রাফায়েল লিয়াও, গনসালো রামোস, পেদ্রো নেতো ও ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওয়ের মতো গতিময় ফুটবলাররা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকি।
মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বের্নার্দো সিলভা ও জোয়াও নেভেসের সৃজনশীলতা দলটিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
অন্যদিকে ডিআর কঙ্গোর জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের আসর। ১৯৭৪ সালে ‘জায়ার’ নামে প্রথম ও একমাত্রবার বিশ্বকাপে খেলেছিল দেশটি। দীর্ঘ ৫২ বছর পর আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে তারা। কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের অধীনে দলটি গড়ে উঠেছে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং দলগত ফুটবলের ওপর ভিত্তি করে।
বাছাইপর্বে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে বিশ্বকাপের টিকেট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকান দলটি। দলে রয়েছেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা, শঁসেল এমবেম্বা, অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে এবং ইয়োয়ানে উইসার মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। বিশেষ করে রক্ষণভাগে এমবেম্বা ও তুয়ানজেবের অভিজ্ঞতা পর্তুগালের তারকাবহুল আক্রমণের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডিআর কঙ্গোর পারফরম্যান্স কিছুটা মিশ্র। চিলি ও আলজেরিয়ার কাছে হারলেও ডেনমার্কের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে তারা। ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে রক্ষণ সামলানোর সামর্থ্য দেখালেও আক্রমণে আরও কার্যকর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
দুই দলের মধ্যে এর আগে কখনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়নি। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে এটিই হতে যাচ্ছে তাদের প্রথম মুখোমুখি লড়াই। ইতিহাসের পরিসংখ্যান না থাকলেও অভিজ্ঞতা, তারকার মান, স্কোয়াডের গভীরতা এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় স্পষ্টভাবেই এগিয়ে পর্তুগাল।
কৌশলগতভাবে ম্যাচটির মূল লড়াই হবে পর্তুগালের আক্রমণ বনাম ডিআর কঙ্গোর রক্ষণ। বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চাইবে মার্তিনেজের দল। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো সঙ্কুচিত রক্ষণ গড়ে তুলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে সুযোগ খুঁজবে। বিশেষ করে উইসার গতি ও কাউন্টার অ্যাটাক তাদের বড় অস্ত্র হতে পারে।
সব দিক বিবেচনায় ম্যাচের ফেবারিট পর্তুগাল। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে চমকের অভাব নেই। ডিআর কঙ্গো যদি রক্ষণে দৃঢ় থাকতে পারে এবং সীমিত সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে, তা হলে রোনালদোদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে। তবু কাগজে-কলমে পর্তুগালই এগিয়ে। ইউসেবিওর উত্তরাধিকার আর রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্নকে সামনে রেখে জয় দিয়েই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে চাইবে ইউরোপের দলটি।
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘কে’-তে মঙ্গলবার মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে তারা মুখোমুখি হচ্ছে কলম্বিয়ার। অভিজ্ঞতার দিক থেকে কলম্বিয়া অনেক এগিয়ে, আর তাদের নেতৃত্বে আছেন হামেস রদ্রিগেজ, দলের আক্রমণ তৈরির মূল কারিগর ও প্লেমেকিংয়ের কেন্দ্রবিন্দু। তার সঙ্গে লুইস দিয়াজের গতি ও আক্রমণভাগের ধার ম্যাচে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
উজবেকিস্তান এবারই প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে ইতিহাস গড়েছে। দীর্ঘ বাছাইপর্বে দারুণ শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্স দেখিয়ে তারা বিশ্বমঞ্চে এসেছে, যেখানে রক্ষণভাগের সংগঠন ও দলীয় ডিসিপ্লিন ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ফাবিও কানাভারোর অধীনে তারা এশিয়ান অঞ্চলে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে কলম্বিয়ার মূল ভরসা হামেস রদ্রিগেজ, যিনি আক্রমণ গড়ে তোলার কেন্দ্র। লুইস দিয়াজ আক্রমণে সবচেয়ে বড় হুমকি, আর দাভিনসন সানচেজ ও অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ডেভিড ওসপিনা রক্ষণভাগকে স্থিতি ও ভরসা দিচ্ছেন কলম্বিয়ার জন্য।
ফিফা র্যাংকিয়ে কলম্বিয়া ১৩তম স্থানে অবস্থান করছে। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত শক্তি হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে উজবেকিস্তান ৫০তম দল, যারা এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলছে। তাই অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচের চাপ সামলানো এবং স্কিলের দিক থেকে এগিয়ে কলম্বিয়াই।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে কলম্বিয়া ভালো ছন্দে আছে। কোস্টারিকা ও জর্ডানের বিপক্ষে জয় এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকায় ফাইনালে ওঠা তাদের শক্ত অবস্থানের প্রমাণ। অন্যদিকে উজবেকিস্তান মিশ্র ফর্মে থাকলেও গ্যাবনের বিপক্ষে জয় এবং ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে ড্র করে রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা দেখিয়েছে।
হেড টু হেডে দুই দলের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচ হয়নি, এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎ। ফলে মাঠে নামবে দুই দলই একেবারে নতুন এক পরীক্ষায়। বিশ্বকাপ ইতিহাসে কলম্বিয়া ছয়বারের বেশি অংশগ্রহণকারী দল, ২০১৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনালই তাদের সেরা অর্জন। উজবেকিস্তানের জন্য এই বিশ্বকাপই প্রথম, যা তাদের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা ও তারকা শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও কলম্বিয়ার সামনে উজবেকিস্তানের সংগঠিত রক্ষণ ও অভিষেকের আবেগ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে থাকবে হামেস রদ্রিগেজের কলম্বিয়াই।
/এসএকে