১৭ জুন মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ও বেদনাময় দিন হিসেবে বিবেচিত। ৬ বছর আগের এ দিনে প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মাদ মুরসি মৃত্যুতে রাজনৈতিকভাবে এক অস্থির সময়ে প্রবেশ করে মিশর। আলোচিত-সমালোচিত এ নেতার মৃত্যু দিনে তাকে স্মরণ করে ফেসবুকে পোস্ট মিশরের সেই অস্থির সময়কে বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। ওই পোস্টে তিনি প্রশ্ন রাখেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়েও।
১৭ জুনকে মিসরের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত ও বেদনাময় দিন উল্লেখ করে মাওলানা মামুনুল হক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ২০১৯ সালের এই দিনে দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মাদ মুরসি আদালতের শুনানিকালে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু, ক্ষমতাচ্যুতি এবং পরবর্তী দমন-পীড়নকে ঘিরে এখনও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক, আর সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে মিসরের সেই অস্থির সময়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের গণআন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক হোসনি মুবারকের পতন ঘটে। এর পরের বছর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী ড. মুহাম্মাদ মুরসি জয়ী হন। প্রায় ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি মিসরের প্রথম বেসামরিক ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর তাকে আটক করা হয় এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু হয়।
ক্ষমতাচ্যুতির পর মুরসি সমর্থকদের আন্দোলন দমনে একাধিক সহিংস অভিযানের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের আগস্টে কায়রোর রাবা আল-আদাবিয়া ও নাহদা স্কয়ারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে এসব অভিযানে শত শত মানুষের প্রাণহানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এসব ঘটনাকে আধুনিক মিসরের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দমন-পীড়ন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সংস্থাটির তদন্ত অনুযায়ী, রাবা স্কয়ারে একদিনেই অন্তত ৮১৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। একই দিনে নাহদা স্কয়ারে আরও ৮৭ জন নিহত হন। অন্যদিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের দাবি ছিল, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৬০০। যদিও তৎকালীন মিসরীয় সরকারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ৬৩৮ জন।
রাবা অভিযানের আগে ও পরেও একাধিক প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটে। জুলাইয়ের শুরুতে রিপাবলিকান গার্ড সদর দপ্তরের সামনে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণে ৬১ জন নিহত হন। একই মাসের শেষ দিকে মানাসসা স্মৃতিসৌধ এলাকার সংঘর্ষে প্রাণ হারান আরও ৯৫ জন। রাবা অভিযানের দুই দিন পর রামসেস স্কয়ারে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, ২০১৩ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মোট এক হাজার ১৫০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হন। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
মুরসির অপসারণের পর হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী, মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থক এবং বিরোধী মতের ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী বছরগুলোতে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দি হন। অনেকের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা দায়ের করা হয়, দীর্ঘমেয়াদি সাজা দেওয়া হয় এবং শত শত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
আটকের পর মুরসির বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা চলতে থাকে। ২০১৯ সালের ১৭ জুন আদালতে শুনানির সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। তার পরিবার ও সমর্থকদের দাবি ছিল, দীর্ঘদিনের নির্জন কারাবাস, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং কঠোর বন্দিজীবন তার মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তিনি স্বাভাবিক কারণে মারা গেছেন।
ড. মুহাম্মাদ মুরসির মৃত্যু এবং ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ আজও মিসরের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের অন্যতম বিষয় হয়ে রয়েছে। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আবারও সামনে এসেছে সেই প্রশ্ন— গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা আসলে কোথায়।
সময়ের আলো/এসএকে