প্রায় ১৪ বছর পর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সার্ভারে যুক্ত হতে যাচ্ছে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভোটার হওয়া নাগরিকদের ফরম-২-এর তথ্য। এতদিন এসব তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে শুধু হার্ডকপি আকারে সংরক্ষিত ছিল। ২০১২ সাল থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়ে ভোটারদের এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অফলাইন থেকে অনলাইনে যুক্ত করা হয়নি।
এতে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনে ভোটার ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি ও হয়রানিরও শিকার হয়েছেন ভোটাররা। তবে এবার এসব হার্ডকপি তথ্য ইসির সিস্টেমে যুক্ত হলে এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইসির তথ্যমতে, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩৩ জন। পরে ২০১২ সালে দেশব্যাপী ভোটার তালিকা হালনাগাদের পর মোট ভোটারের সংখ্যা ৯ কোটি ২২ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এবার ওই ভোটারদের অফলাইন (হার্ডকপি) তথ্য অনলাইনে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।
ইসি সূত্রে জানা যায়, নাগরিকদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রতারণা ও জালিয়াতি রোধ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা নির্বিঘ্নে প্রদান এবং নাগরিকদের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে ২০০৮ সালে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সারা দেশে ছবিযুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) চালু করে।
২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যেসব নাগরিক ফরম-২ পূরণ করে ভোটার হয়েছেন, তাদের তথ্যসংবলিত ফরমগুলো এতদিন ইসির সার্ভারে সংরক্ষিত ছিল না। সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসগুলোতে শুধু হার্ডকপি আকারে রাখা হয়েছিল। ফলে ওই সময়ের ভোটারদের তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে অনেক সময় জটিলতায় পড়তে হতো নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের। একই সঙ্গে ভোগান্তির শিকার হতেন নাগরিকরাও।
তবে ২০১২ সালের পর যেসব নাগরিক ভোটার হয়েছেন, তাদের ফরম-২-এর সব তথ্যই ইসির সার্ভারে সংরক্ষিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনআইডি শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৮ সালে যখন প্রথম ছবিযুক্ত এনআইডি কার্ড চালু হয়, তখন নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে এনআইডির গুরুত্ব বর্তমানের মতো ছিল না। সে সময় অনলাইন সিস্টেমও গড়ে ওঠেনি। ফলে একটি ফরম পূরণ করেই নাগরিকরা ভোটার হতে পারতেন এবং বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হতো না।
তিনি বলেন, তখন নাগরিকদের মধ্যেও এনআইডি নিয়ে সচেতনতা কম ছিল। ফলে অনেকেই সনদপত্রে থাকা নামের পরিবর্তে ডাকনাম ব্যবহার করেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নামের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল হয়েছে। এ কারণে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের ভোটারদের এনআইডিতে ভুলের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আর তাদের ভোটার ফরম অনলাইনে না থাকায় সংশোধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জটিলতা তৈরি হতো।
এ বিষয়ে গত ১৯ মে নির্বাচন কমিশনের মাসিক সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভোটার তথ্য ফরম (ফরম-২) স্ক্যান ও আপলোড কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে ৩০ জুন ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে আঞ্চলিক ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে অপারেটর ও স্ক্যানার সমন্বয় করে কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন।
এ কাজ বাস্তবায়নের জন্য এনআইডি মহাপরিচালক, ‘আইডিইএ-২য় পর্যায়’ প্রকল্পের পরিচালক, সিস্টেম ম্যানেজার এবং সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসির সিস্টেম ম্যানেজার (কারিগরি) মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে বর্তমানের মতো অনলাইনভিত্তিক সিস্টেম ছিল না। ২০১০ সালের পর থেকে অনলাইন সিস্টেম চালু হয়। আগে সব তথ্য হার্ডকপিতে সংরক্ষিত থাকত। এখন সেই হার্ডকপিগুলো স্ক্যান করে সার্ভারে আপলোড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সে সময়ে ভোটার হওয়ার জন্য কত ধরনের নথি নেওয়া হতো, তা নিশ্চিত নন। তবে একটি ফরম পূরণ করা হতো এবং সেই ফরমটিই এখন স্ক্যান করে সার্ভারে সংযুক্ত করা হবে। এর ফলে ভোটারের তথ্য দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে। এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, ভোটার ফরম সার্ভারে সংযুক্ত করার ধারণাটি ২০১২ সাল থেকেই ছিল। তবে তখন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন সেই কাজ শুরু হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে কত কোটি নাগরিক ভোটার হয়েছেনÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপলোডের কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। আশা করা হচ্ছে, ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
দিন দিন এনআইডি সেবার গুরুত্ব বাড়ছে। বর্তমানে আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) গ্রহণ, শেয়ার আবেদন ও বিও হিসাব খোলা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ, পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়ন, যানবাহন নিবন্ধন, চাকরির আবেদন, বীমা স্কিমে অংশগ্রহণ, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব খোলা, নির্বাচনে ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংযোগ, সরকারি ভাতা উত্তোলন, টেলিফোন ও মোবাইল সংযোগ, ই-টিকেটিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) গ্রহণ এবং বিভিন্ন সুরক্ষিত ওয়েবসেবায় লগইন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ছবিযুক্ত এনআইডি অপরিহার্য। আর নাগরিকদের ভোটার হওয়ার সময় দেওয়া সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে ফরম-২-এ।
ভোটার হতে নিবন্ধন ফরম-২-এ যেসব তথ্য দিতে হয় : একজন নাগরিককে ভোটার হতে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন ফরম-২ পূরণ করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই ফরমে ব্যক্তিগত ৩১ ধরনের তথ্য দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে- ভোটার এলাকার নাম ও নম্বর, আবেদনকারীর নাম, পিতার নাম, পিতার এনআইডি নম্বর বা ভোটার নম্বর, পিতা মৃত হলে মৃত্যুর সাল, মাতার নাম, মাতার এনআইডি বা ভোটার নম্বর, মাতা মৃত হলে মৃত্যুর সাল, স্বামী বা স্ত্রীর নাম, স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডি নম্বর, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মৃত্যুর সাল, ১৭ অঙ্কের জন্মনিবন্ধন নম্বর, জন্মতারিখ, জন্মস্থান (জেলা), লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন, রক্তের গ্রুপ, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর (যদি থাকে), পাসপোর্ট নম্বর (যদি থাকে), টেলিফোন নম্বর (যদি থাকে), মোবাইল নম্বর, ধর্ম এবং আবেদনকারীর প্রত্যয়ন।
এ ছাড়া নিবন্ধন কেন্দ্রে আবেদনকারীর ছবি, আঙুলের ছাপ ও স্বাক্ষর দিতে হয়।
/আআ