পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বিদেশে অবস্থানরত অনিয়মিত (অবৈধ কাগজপত্রধারী) বাংলাদেশি অভিবাসীদের বৈধতার সুযোগ বৃদ্ধিতে সরকার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আইন ও নীতির ওপর নির্ভরশীল।
বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মো. জাহান্দার আলী মিয়ার (মাদারীপুর-৩) টেবিলে উত্থাপিত তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা জাতীয় উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমান সরকার তাদের কল্যাণ, অধিকার সুরক্ষা এবং মর্যাদা রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
যেসব দেশে বাংলাদেশি নাগরিকরা যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া কাজ করছেন, সেসব দেশের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, সেসব দেশের আইন ও বিধিবিধানের আওতায় যোগ্য ও কর্মরত বাংলাদেশিদের বৈধতার সুযোগ সম্প্রসারণে আমরা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলো নিয়মিতভাবে কনস্যুলার সহায়তা দিচ্ছে এবং স্বাগতিক দেশগুলোর ঘোষিত সাধারণ ক্ষমা (অ্যামনেস্টি) ও বৈধকরণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে সহায়তা করছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো দেশ যখন অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য অ্যামনেস্টি বা বৈধকরণ কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন আমাদের দূতাবাসগুলো সেখানে অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শ ও সার্বিক সহায়তা প্রদান করে।
ইউরোপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে ড. খলিলুর বলেন, স্পেন সরকারের প্রায় পাঁচ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধ মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি উপকৃত হতে পারেন।
তিনি বলেন, স্পেন সরকার প্রায় পাঁচ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধ মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে আনুমানিক ২০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক বৈধভাবে বসবাস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন। তবে অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধকরণ সম্পূর্ণভাবে স্বাগতিক দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
মন্ত্রী বলেন, কোনো বিদেশি দেশে অবস্থানরত অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধকরণ মূলত সেই দেশের নিজস্ব আইন, নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তাই বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাসগুলোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একতরফাভাবে এ বৈধতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সরকারের সামগ্রিক অভিবাসন নীতির কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনিয়মিত অভিবাসন প্রায়ই মানবপাচার, শ্রম শোষণ, আইনি জটিলতা ও অন্যান্য ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ কারণে সরকার নিরাপদ, বৈধ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
মন্ত্রী জানান, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে বিদ্যমান শ্রমবাজার ধরে রাখা এবং নতুন বাজার উন্মুক্ত করার জন্য কাজ চলছে।
মন্ত্রী সংসদকে জানান, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মাল্টা, মরিশাস, স্পেন, সার্বিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক, ফিজি, আলবেনিয়া, অস্ট্রিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে গায়ানার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
দক্ষতা উন্নয়নই শ্রমবাজার সম্প্রসারণের মূল ভিত্তি উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকার দক্ষতা উন্নয়নকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতার সনদায়ন এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ উদ্যোগের আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশের টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে (টিটিসি) বিনামূল্যে জাপানি ভাষা শিক্ষা চালু করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মধ্যে নার্সিং প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি তাদের টিএএফই ও টিভিইটি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে ৬০ লাখ ডলারের একটি প্রকল্প চালু করেছে।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, বিদেশে কর্মরত প্রতিটি বাংলাদেশিই দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে অনিয়মিত অভিবাসন ব্যক্তি ও দেশের ভাবমূর্তি উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
অনিয়মিত অভিবাসন শুরু থেকেই প্রতিরোধ করতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়েও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/জেডআই