জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেমের খোলনলচে পাল্টে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদ সচিবালয়। আধুনিকায়নের এই প্রক্রিয়ায় কোন ব্র্যান্ডের ও মডেলের সিস্টেম বসবে, তা চূড়ান্ত হবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পছন্দ ও নির্দেশনার ভিত্তিতে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে আগামী বছরের শুরুতেই নতুন সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের কাজ শুরু হতে পারে। তবে ততদিন পর্যন্ত সংস্কার করা বর্তমান সাউন্ড সিস্টেম দিয়েই সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। চলতি বাজেট অধিবেশনে, বিশেষ করে বাজেট উপস্থাপনের দিন কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি না হওয়ায় সংসদ সচিবালয় আপাতত স্বস্তিতে রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদফতর ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সাউন্ড সিস্টেমটি ২০২২ সালে স্থাপন করা হয়েছিল, যা মূলত একটি তারযুক্ত সিস্টেম। বর্তমানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তির উৎপাদন বন্ধ করে সম্পূর্ণ তারহীন প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বিদ্যমান সিস্টেমের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল ইউনিট বা পাওয়ার সাপ্লাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তার বিকল্প পার্টস পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। সংস্কারের পর বর্তমানে লুপক্যাবলসহ সংযোজিত ক্যাবল পরিবর্তনের মাধ্যমে সাউন্ড সিস্টেম সচল রাখা হয়েছে। তবে সংস্কার বা মেরামতের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে এই সিস্টেম চালানো সম্ভব নয় বলেই আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, নতুন সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনে দুটি বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ মানের সিস্টেমের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা। তবে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম স্থাপন করা হলে ব্যয় ৪০ থেকে ৪২ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই প্রকল্পের জন্য বিশ্বের নামকরা ব্র্যান্ড বেলজিয়ামের টেলিভিক, জার্মানির ব্রহলার ও বোশ এবং চীনের টায়ডেন ব্র্যান্ড বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতাকে ইতিমধ্যে একটি প্রেজেন্টেশন দেখানো হয়েছে গণপূর্ত অধিদফতরের পক্ষ থেকে। তিনি সিস্টেমগুলোর ফিজিক্যাল মডিউল বা নমুনা দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার সামনে এই ‘ফিজিক্যাল প্রেজেন্টেশন’ দেওয়ার পর তার পছন্দের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ব্র্যান্ড ও মডেল নির্বাচন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে আগামী বছরের শুরুতে এই কাজ শুরু হতে পারে।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাউন্ড সিস্টেম। অধিবেশন কক্ষের টেবিলের ওপর স্থাপিত একাধিক মাইক্রোফোন ভেঙে ফেলা হয়েছিল। একই সঙ্গে সিমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন সিস্টেম (এসআইএস) এবং মূল সাউন্ড সিস্টেমের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। নতুন করে সাউন্ড সিস্টেম ও এসআইএস স্থাপন করতে হলে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হতো। কিন্তু নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামো সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় ধরে কারিগরি মূল্যায়ন, ত্রুটি শনাক্তকরণ, ক্যাবলিং নেটওয়ার্ক সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থা পুনরায় সচল করেন। এ কাজে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা। ফলে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হলেও সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে কয়েক দফা সাউন্ড সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় স্পিকারকে বিব্রত হতে হয়। পুরো ঘটনায় নাশকতার অভিযোগ উঠলে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তবে তদন্তে নাশকতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগ ই/এম-৭ এর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হয়। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রিসালাত বারী দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি সাউন্ড সিস্টেম পুনরুদ্ধারে একাধিক উদ্যোগ নেন। প্রকৌশলীরা শুধু দৃশ্যমান যন্ত্রাংশ নয়, বরং অধিবেশন কক্ষের অভ্যন্তরীণ ক্যাবলিং নেটওয়ার্কও পরীক্ষা ও সংস্কার করেন। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করে ধাপে ধাপে সমাধান করা হয়। একই সঙ্গে এসআইএস ব্যবস্থাও পুনরায় কার্যকর করা হয়, যাতে বিদেশি অতিথি ও কূটনীতিকদের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষান্তর সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে দিন-রাত পরিশ্রম করা হয়। এরই ফল হিসেবে চলতি বাজেট অধিবেশনে, বিশেষ করে বাজেট উত্থাপনের দিন, সংসদের সাউন্ড সিস্টেমে কোনো ধরনের ত্রুটি দেখা যায়নি। সংসদ সদস্য, কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
গণপূর্ত অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মাহবুবুল হক চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, স্পিকার, চিফ হুইপ এবং গণপূর্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনায় বর্তমান সাউন্ড সিস্টেমের প্রয়োজনীয় সংস্কার, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অধিবেশন কক্ষের ১৪টি স্পিকার বদলানো হয়েছে। প্রথম অধিবেশনের শেষ ১৫ থেকে ২০ দিনে কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। বাজেট অধিবেশনও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে। আর কোনো সমস্যা হবে না বলে তারা আশাবাদী।
/আআ