মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত দুরূহ। আর এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপের ফলে মাঠ পর্যায়ে করদাতারা হয়রানির শিকার হতে পারেন। বুধবার রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী এক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে কামরান টি রহমান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর যেখানে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ বা ৩.২৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে, সেখানে কোনো ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নতুন অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত দুরূহ।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৮.২ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
এদিকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সবার আগের বাংলাদেশের মতো করে সবার আগে বিনিয়োগ ও সবার জন্য অর্থনীতি- এই নতুন মডেলে যাওয়ার গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, জনগণের আস্থা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ ও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়েই বাংলাদেশ নতুন অর্থনৈতিক উত্তরণে পৌঁছাতে পারে।
এমসিসিআই ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। এ সময় পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার ও এমসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুল্লাহ এন করিম বক্তব্য রাখেন।
সংলাপে দেশে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতি কমাতে পারলে রাজস্ব আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। তিনি জানান, দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তিন ধাপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং রফতানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিতুমীর বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট খাতে পৃথক টাস্কফোর্স কাজ করছে। প্রতিটি খাতের জন্য মাসভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও মাইলস্টোন নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তার মতে, অতীতে রাজস্ব আয়ের যে তথ্য উপস্থাপন করা হতো, তার অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল না। বর্তমানে তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়; পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়াতে হবে। বর্তমানে পরিচালন ব্যয় দ্রুত বাড়লেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বা মূলধনী ব্যয় সেই হারে বাড়ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং পরিচালন ব্যয় ও মূলধনী ব্যয়ের অনুপাত পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির সমালোচনা করে অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, দেশে এমন প্রকল্প রয়েছে যা ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে চলমান, একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সংস্কার প্রয়োজন। এ জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প অনুমোদন, বাস্তবায়ন এবং মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এদিকে উন্মুক্ত তথ্যনীতি (ওপেন ডাটা পলিসি) বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ (বিবিএস) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাশেদ আল মাহমুদ আরও বলেন, বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সক্ষমতা ব্যয় ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।
/আআ