প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মোট বাজেটের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক কার্যক্রমে বরাদ্দ করা হয়েছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার জাতীয় লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা, উচ্চ ভর্তুকি ও সীমিত সবুজ বিনিয়োগ জ্বালানি রূপান্তরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডি সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট : জ্বালানি খাত কী পেল’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি। তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
আলোচনায় সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, বিএসআরইএর প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদ, ইডকলের চিফ রিস্ক অফিসার মোহাম্মদ জাবেদ ইমরান, বিএলআরআই সাবেক ডিজি জাহাঙ্গীর আলম খানসহ খাত সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রবন্ধে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে জাতীয় বাজেটে এ খাতের অংশীদারত্ব ২ দশমিক ১৫ থেকে কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। নতুন বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে চলমান ও সমাপ্তির পথে থাকা প্রকল্পগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই এ বরাদ্দ কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে জ্বালানি বিভাগে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭২ শতাংশ বেশি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগকে এ বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিপিডি জানায়, বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও রয়েছে। ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে শূন্য শতাংশ কর সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সোলার ইনভার্টার ও কিছু যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ২৮ থেকে কমিয়ে ২২ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের নিবন্ধন ফি হ্রাস এবং চার্জিং স্টেশনের করহার ৩৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৬ শতাংশ করার প্রস্তাবকেও স্বাগত জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সংখ্যা ৬টি থেকে কমে ৫টিতে নেমে এসেছে। এ ছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়া সৌর সেচ প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে সিপিডি। তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামে শুল্ক ছাড়ের ক্ষেত্রে আরোপিত কঠোর শর্ত সাধারণ ভোক্তাদের জন্য এসব সুবিধা গ্রহণকে জটিল করে তুলবে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, এলএনজি আমদানিতে কর ও শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং নতুন করে কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। ফলে জ্বালানি রূপান্তরের গতি শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভর্তুকির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং এলএনজি খাতে ১১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো তেল খাতের জন্য আলাদাভাবে ১০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সরকারি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
জ্বালানি খাতে টেকসই রূপান্তর নিশ্চিত করতে কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন বাজেটের অন্তত ২০-৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ দেওয়া, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও স্মার্ট গ্রিডে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সৌর সেচ প্রকল্পে বিশেষ ভর্তুকি চালু এবং একটি ‘গ্রিন সাবসিডি ফান্ড’ গঠন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড়ের শর্ত সহজ করে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিপিডি মনে করে, শুধু কর-সুবিধা বা বিচ্ছিন্ন প্রণোদনা নয়, বরং একটি কার্যকর সবুজ রাজস্ব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোই দেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান পথ।
/আআ