কৃষিঋণ ৪ শতাংশ বাধ্যতামূলক

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সর্বমোট ৬০ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ

2026-08-18T04:37:47+00:00
2026-08-18T04:37:47+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
অর্থনীতি
কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ঘোষণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
কৃষিঋণ ৪ শতাংশ বাধ্যতামূলক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম 
কৃষিঋণ ৪ শতাংশ বাধ্যতামূলক । ছবি : সময়ের আলো গ্রাফিক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সর্বমোট ৬০ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই নীতিমালার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষির অসামান্য অবদান, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অভিপ্রায়ে এই বড় ধরনের লাফ দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নীতিমালা ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নররা, চিফ ইকোনমিস্ট, নির্বাহী পরিচালকরা এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

নতুন নীতিমালার অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণের ওপর নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। এখন থেকে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে ছিল মাত্র আড়াই শতাংশ। ফলে বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর কৃষি খাতে অর্থায়নের বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার মোট ঋণ লক্ষ্যমাত্রার অঞ্চলভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনে দেখা যায়, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০,৪৯৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট ৩৯,৫০৫ কোটি টাকা। ঋণের সার্বিক প্রবাহ ও বিতরণ কার্যক্রম কার্যকরভাবে নজরদারি করতে এবং নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা আনতে ‘ওয়েব বেসড এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস সফটওয়্যার’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।

এবারের নীতিমালায় প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ ও ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াকে অতিমাত্রায় সহজ ও বৈষম্যহীন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করতে এবার কৃষক যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নমনীয় পথ গ্রহণ করা হয়েছে।

এখন থেকে কোনো কৃষক ঋণ পেতে চাইলে কেবল স্থানীয় কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়নপত্র কিংবা সরকারের দেওয়া ‘কৃষক কার্ড’ সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন করলেই তা গ্রাহক পরিচিতি হিসেবে গ্রহণ করা হবে। ঋণ প্রক্রিয়াকরণের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকের বাধ্যতামূলক ‘পাসবই’ থাকার বিধানটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদ বা ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’-এর আওতায় ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পূর্বানুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল করা হয়েছে, যা বাণিজ্যিক কৃষি উৎপাদনে যুক্ত কৃষক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।

ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও নারী কৃষকদের ঋণের আওতায় আনাই হলো এই নীতিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে নারীদের অর্থায়ন সহজ করতে প্রচলিত স্থাবর সম্পত্তি বা জবরদস্তিমূলক বন্ধকের পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যাংকগুলোকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ব্যক্তিগত গ্যারান্টি, সামাজিক সম্মতি বা দলগত জামানত ব্যবহার করে খুব সহজেই কৃষকরা ঋণ উত্তোলন করতে পারবেন।


বিশেষত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে প্রচলিত স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে এরূপ বিকল্প জামানত বিবেচনা করা হবে। তা ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির সার্বিক চালিকাশক্তি বাড়াতে দলগত ঋণের সুযোগ পরিবর্ধন করা হয়েছে এবং সেখানে দলের সদস্যসংখ্যার ক্ষেত্রে যে পূর্বনির্ধারিত সীমাবদ্ধতা ছিল তা তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২.৫ একর পর্যন্ত জমিতে লবণ উৎপাদনের যুক্ত চাষিদের ক্ষেত্রে প্রচলিত চার্জ ডকুমেন্ট ব্যতীত অন্য কোনো বাড়তি বা নতুন নথি জমা দেওয়া থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নানামুখী বৈচিত্রায়ণের বিষয়টি মাথায় রেখে ঋণ বিতরণের নতুন নতুন খাত উন্মুক্ত করা হয়েছে। সনাতন শস্য চাষের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় কৃষিকে অর্থায়নের আওতায় আনা হয়েছে। নীতিমালায় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাছ ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের বাণিজ্যিক হ্যাচারি স্থাপন এবং উট পালনের মতো আনকমন খাতগুলো। এ ছাড়া বিদেশি ও উচ্চমূল্যের ফলের মধ্যে ব্লুবেরি এবং ভেষজ ও বাণিজ্যিক উদ্ভিদের মধ্যে শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, মিছরি দানা, রোজেলা, শতমূল ও গাছ আলু চাষে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাবে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির প্রসারে ডিমের খোসা ব্যবহার করে জৈব সার উৎপাদনের উদ্যোগেও মিলবে ঋণ সুবিধা।

সারা বছরজুড়ে যেসব ফল বা ফসল উৎপাদিত হয়- যেমন কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচু চাষের ক্ষেত্রে কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে পরিশোধ সূচিতে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফল সংগ্রহের পর ফসল বাজারে বিক্রি করা পর্যন্ত সময় বিবেচনা করে ঋণ পরিশোধের নমনীয় সময়সীমা বা গ্রেস পিরিয়ড নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের কৃষি খাতকে সুরক্ষা দিতে এতে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক ও কৃষকের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্মতির ভিত্তিতে চাষিদের বীমা সুবিধার আওতায় আনার কাঠামোগত দিক উন্মোচন করা হয়েছে, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বড় প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করছে যে, এই জনবান্ধব, নমনীয় এবং প্রসারণমূলক নীতিমালার মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে ঋণ প্রবাহ অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। এটি কেবল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিই করবে না, বরং দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এক অবিস্মরণীয় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে


  বিষয়:   কৃষিঋণ  ৪ শতাংশ  বাধ্যতামূলক  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: