মূল্যস্ফীতি কমছিল। কয়েক মাস ধরে সেই ধারায় কিছুটা স্বস্তিও ফিরছিল অর্থনীতিতে। কিন্তু সেই স্বস্তি এখন কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি, দেশে জ্বালানির দাম সমন্বয় এবং নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য প্রভাব— সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি আবারও চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলতি অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নীতিসুদের হার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, এখনই সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই সামনে দুয়েক মাসের পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কমছিল মূল্যস্ফীতি, সামনে নতুন চাপ : সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। জুনে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২ শতাংশে নামে। কিন্তু এই প্রবণতাকে এখনই স্থায়ী ধরে নিতে চাইছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন খরচে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে সংকট দীর্ঘ হলে শুধু জ্বালানি নয়, সারসহ অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক দামও বাড়তে পারে। দেশেও এরই মধ্যে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর প্রভাব অর্থনীতিতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে সময় লাগবে। তার সঙ্গে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন হলে মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ যাবে। এতে ভোগ ও চাহিদা বাড়তে পারে। এই দুই ধরনের চাপ— জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যয়ের চাপ এবং বাড়তি চাহিদা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বেগের বড় কারণ।
নীতিসুদ কমানোর পথ আপাতত বন্ধ : গত মুদ্রানীতিতে নীতিসুদ ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। এরপরও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং মুদ্রানীতির অবস্থান এখনও ‘টাইট’। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, অন্যান্য অনেক দেশ যখন দ্রুত সুদহার কমিয়েছে, বাংলাদেশ তখন মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় সেই পথে যায়নি। ফলে বর্তমানে নীতিসুদ কমানোর চেয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখার অর্থ অবশ্য নতুন করে সুদহার বাড়ানোও নয়। বরং মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড— দুদিকের ভারসাম্য বিবেচনায় আপাতত অপেক্ষার নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থনীতির আরেক প্রান্তে বিনিয়োগের খরা : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এই নীতির বিপরীত দিকে রয়েছে দুর্বল বিনিয়োগ ও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এখনও খুবই কম। অক্টোবর পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ— যেখানে ডিসেম্বরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
ব্যাংকে অর্থের সংকট নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আগস্টে ব্রড মানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ রয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের বড় অংশ ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
এর ব্যাখ্যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, শুধু সস্তা টাকা বা তারল্য থাকলেই বিনিয়োগ বাড়ে না। ব্যবসায়িক আস্থা, অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ, বাজারের চাহিদা এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা— সবকিছুর ওপর বিনিয়োগ নির্ভর করে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছেন না— এই পরিস্থিতি কীভাবে বদলাবে?
৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ : অর্থনীতির গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্ধ শিল্প-কারখানা, এসএমই, কৃষি, রফতানি, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প, গ্রিন ফাইন্যান্স, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এমন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই অর্থ একবারে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা নেই। ধাপে ধাপে এবং নির্দিষ্ট খাতে অর্থ দেওয়ার কথা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্যাকেজ বাস্তবায়নে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ১৮ মাসের একটি পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা হবে।
খেলাপি ঋণ বড় বাধা : ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পথে আরেকটি বড় বাধা খেলাপি ঋণ। ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ— দুটিই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগসহ কিছু নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত সাড়া এখনও পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি : অর্থনীতির বৈদেশিক খাত অবশ্য তুলনামূলক স্বস্তি দিচ্ছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরে বাজার থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে পেরেছে। এতে রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা হয়েছে এবং বিনিময় হারেও তুলনামূলক স্থিতিশীলতা এসেছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘ হলে এই স্বস্তির জায়গাতেও চাপ আসতে পারে। জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সুদহার ও আর্থিক পরিস্থিতি কঠোর হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দুটি বিপরীতমুখী চাপ। একদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে আবার বাড়তে না পারে সে জন্য সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাই একদিকে নীতিসুদ অপরিবর্তিত রেখেছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন সহায়তা দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা দীর্ঘায়িত হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার কোন দিকে যায়, দেশে মূল্যস্ফীতির গতিপথ কী হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা ফেরে— এসবের ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী মুদ্রানীতির পথ।
বাংলাদেশ ব্যাংকও বলছে, আগামী এক-দুই মাসের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর নীতিসুদের বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ আপাতত অপেক্ষা— তবে সেই অপেক্ষার সময়টিই ঠিক করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে নাকি অর্থনীতিতে আবার নতুন চাপ তৈরি হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে