নভেম্বর পর্যন্ত কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি ক্রেতাকে জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে নির্ধারিত কয়েকটি কার্গো সরবরাহ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি নিয়ে চাপ রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের প্রয়োজন মেটাতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা রয়েছে বাংলাদেশের। কাতারের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ছেদ তৈরি হলে সরকারের জন্য বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চাপ আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতারএনার্জি কয়েক দফায় এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করেছে। গত মার্চ-এপ্রিল থেকে এ পরিস্থিতি চলছে। সর্বশেষ নোটিসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি এশীয় ক্রেতার জন্য সরবরাহ স্থগিতের মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর তথ্য জানানো হয়েছে।
নভেম্বরের দুই কার্গো নিয়েও প্রশ্ন
কাতারের সরবরাহ বন্ধের খবরের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার নভেম্বর মাসের জন্য কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকে দুটি অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কার্গো দুটি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে। এগুলো ৬ ও ২২ নভেম্বর দেশে আসার কথা রয়েছে।
কার্গো দুটি জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) মূল্যের চেয়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে ০.০২ ডলার কম দরে কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলেছে, দেশের বাড়তি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে কাতারএনার্জি যখন নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহে বাধার কথা জানিয়েছে, তখন ওই দুটি কার্গো নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ও নিশ্চিত নয়।
বিকল্প উৎসে বাড়বে চাপ
কাতারের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ছেদ হলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেটসহ অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ বাড়াতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কারণ হরমুজ প্রণালির সংকটের পাশাপাশি উত্তর গোলার্ধে শীতের মৌসুম সামনে আসছে। এ সময়ে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা সাধারণত বাড়ে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্পট বাজারের দামে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী আগস্টের শেষ নাগাদ কাতারের এলএনজি রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ওই সময়ে মাত্র ১৮টি কার্গো রফতানি করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল ৫০৯টি।
তবে সাম্প্রতিক হরমুজ দিয়ে কাতার-সংশ্লিষ্ট কিছু এলএনজি ট্যাঙ্কার চলাচল বাড়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থবির নয়। কিন্তু কাতারএনার্জি এখনও ক্রেতাদের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো অবস্থায় যায়নি।
গ্যাসের ঘাটতিতে নতুন চাপ
দেশে এমনিতেই গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে এলএনজি আমদানিতে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন হলে এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনে ঘাটতি সামাল দিতে হলে ব্যয়ও বাড়বে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া না গেলে শুধু বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় এলএনজি সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে— এমন আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষণে।
অন্যদিকে কাতারের রফতানি অবকাঠামোতেও ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব রয়েছে। রাশ লাফান এলএনজি স্থাপনায় মার্চে হামলার পর কাতারের রফতানি সক্ষমতার একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এর আগে জানিয়েছিলেন, হামলায় দেশটির এলএনজি রফতানি সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি কাতারের উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করাও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য কাতারের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ পাওয়া অনিশ্চিতই থাকছে।
সব মিলিয়ে নভেম্বর পর্যন্ত কাতারের এলএনজি সরবরাহে ছেদ বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। নির্ধারিত কার্গো সময়মতো না এলে ঘাটতি মেটাতে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না। এতে সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কাতারের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশকে এখন বিকল্প উৎসের পাশাপাশি স্পট মার্কেটের সরবরাহ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক দাম এবং শীতকালীন চাহিদা— সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আগাম পরিকল্পনা করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি