দেশে নতুন ব্যবসা শুরু ও বিদ্যমান ব্যবসা সচল রাখার প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে এবং উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক ভোগান্তি কমাতে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগের বার্তা দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ট্রেড লাইসেন্স নিবন্ধন ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ ও নানামুখী জটিলতা দূর করতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু এবং লাইসেন্স ফি পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে শহরের বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে যানজট নিরসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অটোরিকশার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোববার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে যৌথভাবে আয়োজিত ‘সপ্তাহব্যাপী ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসেবা কার্যক্রম’র উদ্বোধন এবং ‘স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা, যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ট্রেড লাইসেন্সসেবা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
২০ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে এ বিশেষ সেবা দেওয়া হবে, যেখানে ঢাকা চেম্বারের সদস্য প্রতিষ্ঠানসহ অন্য ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ব্যবসায়ীদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় সহায়ক ও সহজ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এক অবহেলায় সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, অন্য অবহেলায় সাধারণ জনগণ উন্নত নাগরিক সেবা পাবে।
ব্যবসায়ীদের আস্থা ও স্বচ্ছতা ফেরাতে ডিএসসিসির কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি শনিবার গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ শুনানিতে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ নগরবাসীকে উপস্থিত থেকে সরাসরি মতপ্রকাশ ও সমস্যা তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়।
ট্রেড লাইসেন্সকে সহজ ও সাশ্রয়ী করার বিষয়ে প্রশাসক জানান, নতুন ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফিতে যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উৎসে কর বা অন্যান্য চার্জ হ্রাস করা যায়, তবে সিটি করপোরেশন থেকেও লাইসেন্স ফি আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ডিএসসিসি এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৮০টি নিবন্ধিত ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও বাস্তবে মোট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সব ব্যবসায়ীকে বৈধভাবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের হয়রানিমুক্ত সেবা দিতে ডিজিটাল পদ্ধতির পূর্ণ প্রয়োগের পাশাপাশি ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর বিষয়টি বর্তমানে সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স প্রাথমিক এবং বাধ্যতামূলক দলিল হলেও এটি গ্রহণ বা নবায়নে তথ্যের অস্পষ্টতা, প্রয়োজনীয় কাগজের জটিলতা এবং একাধিকবার দফতরে দৌড়ঝাঁপ করার কারণে উদ্যোক্তারা ক্ষতির সম্মুখীন হন। এতে ব্যবসা শুরু বা পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যয় বেড়ে যায়। এ অবস্থা নিরসনে তিনি এক আবেদনের ভিত্তিতে একাধিক বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়নের সুবিধা প্রবর্তন এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার পরিধি বাড়ানোর জোর দাবি জানান।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান জানান, করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ২৯৪ প্রকৃতির ব্যবসার ধরনে সেবা দেওয়া হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডিএসসিসি ট্রেড লাইসেন্স খাত থেকে ১৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। নগরীর সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উন্নত সেবাদানের জন্য এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ীদের সক্রিয় সহযোগিতা ও সময়মতো লাইসেন্স নবায়নের অনুরোধ করা হয়।
কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনই নয়, ব্যবসায়ের ভৌত পরিবেশ উন্নত করতে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা ও যানজট কমানোর ওপর আলোকপাত করা হয়। পুরান ঢাকার সংকীর্ণ রাস্তাগুলোতে যানবাহনের চাপ কমাতে বেশ কিছু সড়কে একমুখী চলাচল বা ‘ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানান সিটি প্রশাসক। এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পূর্ণ সহযোগিতা চাওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. মাসুদ করিম স্পষ্ট করেন যে, নিবিড় নিরাপত্তা না থাকলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ে। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাক থেকে পণ্য খালাসের সময় কোনো পুলিশ সদস্য অনৈতিক সুবিধা বা হয়রানি করলে সরাসরি তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।
এ ছাড়া নগরের যানজট নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে এআই প্রযুক্তিচালিত ক্যামেরা স্থাপন করে সাফল্য মেলায় এর আওতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। সড়ক ও ফুটপাথে অবৈধ জটলা এবং থ্রি-হুইলারের বিশৃঙ্খলা বন্ধে একটি সমন্বিত নীতিমালার কাজ চলছে, যা শেষ হলে নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট প্রদানের মাধ্যমে তাদের মনিটরিং করা সম্ভব হবে।
মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইর সাবেক ও বর্তমান নেতারা সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের উদ্দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ, ফুটপাথ দখলমুক্তকরণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কঠোর পদক্ষেপের দাবি তোলেন। আলোচনা শেষে ডিএসসিসি প্রশাসক ঢাকা চেম্বারের ১০টি সদস্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির হাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নবায়নকৃত ট্রেড লাইসেন্সের কপি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন নেতারা এবং খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/এসএকে