গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম সরকারি সফরে আগামী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা ভারত বা চীন- কারও ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে এগিয়ে নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং আসন্ন সফর তারই প্রতিফলন। এই সফরে জনশক্তি-সংক্রান্ত ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকটসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোও গুরুত্ব পাবে। সফরে কম-বেশি পাঁচটি ইন্সস্ট্রুমেন্ট নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনায় সম্মতি হতে পারে। আগামীকাল শনিবার ঢাকায় এ সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করার কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করতে ঢাকা-কুয়ালালামপুরের কূটনীতিকরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে কাজ করছেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছিল।
ঢাকায় নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মুহাম্মাদ শুহাদা বিন ওসমান প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর নিয়ে গত বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরে মানবসম্পদ, হালাল খাদ্য, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব ইস্যুতে আলোচনা হবে। সফরে দুই পক্ষের মধ্যে কম-বেশি পাঁচটি ইন্সস্ট্রুমেন্ট নিয়ে সমঝোতার প্রত্যাশা রয়েছে, যার মধ্যে দুই-তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে ২২ জুন সকালে দুই দেশের সরকারপ্রধানদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক গত সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরের মাধ্যমে এ বাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, মূলত দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়েছে। দুর্নীতি নির্মূল না করে এই বাজার পুনরায় চালু করা হলে তা আবারও ব্যর্থ হতে পারে। তিনি বলেন, গত এপ্রিলে সরকার মালয়েশিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আগের পরিস্থিতি ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে।
ঢাকার একজন কূটনীতিক বলেন, নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ফোনে অভিনন্দন জানান এবং মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চায়। প্রবাসী শ্রমিক, বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এ সফরের প্রধান ফোকাস।
তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তবে আগামী এক বছরে দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৩০-৪০ হাজার নতুন কর্মী নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনছে, যা গত ১ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। এ ব্যবস্থায় এআইভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার লক্ষ্য দালালমুক্ত ও কম খরচে কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করা।
নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি কর্মীদের ওপর ট্যাক্স (মাল্টি-টায়ার লেভি মেকানিজম বা এমটিএলএম) বৃদ্ধি, কর্মচারী ভবিষ্যৎ তহবিল (ইপিএফ) এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা (এসওসিএসও) ফান্ড বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে এমটিএলএম ও এসওসিএসও ২০২৫ সাল থেকেই কার্যকর হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন সিস্টেমের নাম ‘বেস্টিনেট’। মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, নতুন কর্মপন্থা এখনও পর্যালোচনাধীন, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। চলতি জুনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি অনুমোদন দিতে পারে। সফরে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
ওই কূটনীতিক আরও বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছে। ঢাকা ২০২৬ সালের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করতে চায়। সফরে এ বিষয়ে অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে। যদিও টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন্সে ঐকমত্য হয়েছে, কিছু জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। বাংলাদেশ শুল্ক হ্রাস, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ফুটওয়্যার ও ওষুধ শিল্পে সুবিধা চায়।
২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে, আর প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক ও কৌশলগত বিশ্লেষক মো. হিমেল রহমান বলেন, ঢাকা সম্ভবত মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে উদ্যোগ নেবে এবং রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক সমর্থন চাইবে। তার মতে, মালয়েশিয়াকে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নেওয়া দুটি বার্তা দেয়- একটি হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রদর্শন, আরেকটি হলো ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিরপেক্ষ অবস্থান।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফরটি পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হবে এবং এতে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, যৌথ বিবৃতি, সমঝোতা স্বাক্ষর ও সফর-পরবর্তী প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে। তার মতে, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ালে সফরটি আরও অর্থবহ হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও