বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সই ঢাকা-ওয়াশিংটনের

এমএকে জিলানী

জাতীয়

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র।

2026-09-27T00:51:05+00:00
2026-09-27T00:51:05+00:00
 
  রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১২ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সই ঢাকা-ওয়াশিংটনের
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। এ চুক্তির মধ্য দিয়ে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে যাচ্ছে দুই দেশ।

কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, উন্নত রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সহযোগিতা জোরদার করবে। বিশেষ করে স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক কম সময়ে ও কম জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা যখন বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন এই সহযোগিতা পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্প্রসারণে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে। শুক্রবার নিউইয়র্কে এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে বিএনপির মিডিয়া সেল। তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুকে শনিবার এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির অর্থনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তির ফলে পারমাণবিক শক্তি, উন্নত চুল্লি প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, প্রবিধান, গবেষণা এবং বিদ্যুৎবহির্ভূত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কূটনীতিকদের মতে, ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তির অর্থ হলো, উভয় পক্ষ জ্বালানি নিরাপত্তাসহ তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্য স্বীকার করেছে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এই চুক্তির পেছনে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য শান্তিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, যা দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা করবে।

মূলত, এ চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষই স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এসএমআর হলো পরবর্তী প্রজন্মের উন্নত পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, যা প্রথাগত বা বিশাল আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায়আয়তনে অনেক ছোট এবং মডিউলার প্রযুক্তিতে তৈরি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেসব পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি ইউনিটে ৩০০ মেগাওয়াট বা তার কম, সেগুলোকে স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর বলা হয়।

এসএমআর প্রযুক্তিতে বাহ্যিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া চালু থাকে। এতে প্রাকৃতিক মাধ্যাকর্ষণ, পরিচালন ও অভ্যন্তরীণ চাপ ব্যবহার করে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। প্রথাগত প্ল্যান্ট নির্মাণে বিশাল জমি ও দীর্ঘ সময় (১০-১৫ বছর) লাগে। কিন্তু এই প্রযুক্তিতে অত্যন্ত কম জমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র তৈরি করা যায় এবং কারখানায় মডিউল তৈরি হওয়ায় ২-৪ বছরের মধ্যে স্থাপন করা সম্ভব। সাধারণ বিশাল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে যে বিপুল আর্থিক ঝুঁকি থাকে, এসএমআরে সেই বিনিয়োগ অনেক কম। প্রয়োজন অনুযায়ী একটি কেন্দ্রে একটির পর একটি মডিউল যুক্ত করে ক্ষমতা বাড়ানো যায়।

এর আগে, গত ১৯৮১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সংক্রান্ত একটি সহযোগিতা চুক্তি হয়েছিল এবং গত ১৯৯৩ সালে নোট বিনিময়ের মাধ্যমে সেই চুক্তি নবায়ন করা হয়। সবশেষ ওই চুক্তির মেয়াদ গত ২০১২ সালে শেষ হয়। এরপর এটি আর নবায়ন করা হয়নি।

এদিকে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তা অর্জন এবং বিদ্যুৎ খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। গত ২০১১ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রথম মূল আন্তঃসরকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

গত ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রসেটম) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মধ্যে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের কংক্রিট ঢালাইয়ের মাধ্যমে ১ নম্বর ইউনিটের মূল অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। 

গত ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই ২ নম্বর ইউনিটের মূল অবকাঠামো ও ফার্স্ট কংক্রিট ঢালাই শুরু হয়। রূপপুরের এই প্রকল্প পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এরই মধ্যে প্রথম ইউনিটের কাজ শেষের দিকে। আগামী মাসে এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হওয়ার কথা রয়েছে।

শুক্রবার স্বাক্ষর হওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তির প্রতি রাশিয়া, চীন ও ভারত গভীর নজর রেখেছে। গত সরকারের আমলে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক ভালো না থাকায় ওই সময়ে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্র তেমন গুরুত্ব পায়নি। 

গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পটপরিবর্তন হলে এই বিষয়ে নজর দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর ৩০ জুলাই তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে এসে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তির প্রস্তাব দেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে গত ৯ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে একটি খসড়া প্রণয়ন করেন। এতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুক্রবার স্বাক্ষর হওয়া কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তির বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো পক্ষই কিছু প্রকাশ করেনি। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী উভয় সরকার জ্বালানি নিরাপত্তাসহ তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্য স্বীকার করে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায়।

উভয় পক্ষ স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টরসহ (এসএমআর) পারমাণবিক শক্তির সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে এবং যেকোনো সম্প্রসারণ অবশ্যই দায়িত্বশীলভাবে এবং নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মান অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশ নিজ নিজ নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানির চাহিদা মেটাতে যৌথভাবে সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করবে। 


উভয় পক্ষ বাংলাদেশের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে, যার মধ্যে উন্নত রিঅ্যাক্টর ও এসএমআরের মতো নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা সমর্থন করবে। সব বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাকে অবশ্যই পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অপ্রসারণের সর্বোচ্চ মানদণ্ড মেনে চলতে হবে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক তথ্য বিভাগের পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনন্দ কুমার দাস দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ‘কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, যা ইতিবাচক। এই চুক্তির ফলে মানুষের কল্যাণে পারমাণবিক সহযোগিতার ব্যবহারে আরও প্রসার ঘটবে। 

সিভিল নিউক্লিয়ার বিষয়টি এই মুহূর্তে আমাদের দেশে ক্যানসারসহ একাধিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে এবং খাবার ও মসলার তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ইস্যুতে উন্নত দেশগুলো এসএমআর নিয়ে কাজ করছে, যা সহজে ও কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। উন্নত দেশগুলো এখনও এ বিষয়ে গবেষণা করছে।’

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   বেসামরিক  পরমাণু চুক্তি  ঢাকা  ওয়াশিংটন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: