একটি রাষ্ট্রের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; রাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনগণের প্রতি কর্তব্যবোধের প্রতিফলন। কোনো দেশের সরকার যখন বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে, তখন প্রকৃতপক্ষে সে নির্ধারণ করে দেয়- কারা উন্নয়নের সুফল পাবে, কোন খাতগুলো গুরুত্ব পাবে এবং সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাই বাজেটকে অনেক অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী রাষ্ট্রের ‘নৈতিক দলিল’ বলে আখ্যায়িত করেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে বাজেটের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষত দরিদ্র, এতিম, বিধবা, শ্রমজীবী, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, ইসলাম এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে উন্নয়নের সুফল কেবল বিত্তবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষ তার ন্যায্য অধিকার লাভ করবে।
ইসলামে বঞ্চিত মানুষের মর্যাদা
ইসলাম পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এমন একটি ব্যবস্থা উপস্থাপন করেছে, যেখানে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার এতিম, মিসকিন, অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের নির্ধারিত অধিকার’ (সুরা যারিয়াত : ১৯)।
এই আয়াত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, দরিদ্র মানুষের সহায়তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং এটি তাদের অধিকার। সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদে তাদেরও অংশ রয়েছে। ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাকেও বহু শতাব্দী আগে অতিক্রম করেছে। কারণ ইসলাম বঞ্চিত মানুষের কল্যাণকে ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
বঞ্চিত মানুষের অধিকার
বাজেটে নির্ধারিত হয় দেশের সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে। বাজেটে যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাত পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়, তা হলে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়। আর যদি অধিকাংশ অর্থ সীমিত কিছু খাতে বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য ব্যয় হয়, তা হলে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রের অর্থ আসে জনগণের কর, প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প-বাণিজ্য ও অন্যান্য উৎস থেকে। ফলে জাতীয় সম্পদের ওপর বঞ্চিত মানুষেরও অধিকার রয়েছে। তারা হয়তো সরাসরি কর দেয় না, কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে জাতীয় সম্পদের ন্যায্য অংশ পাওয়ার অধিকার তাদের আছে। তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত- সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় নিয়ে আসা।
দারিদ্র্য বিমোচন ও বাজেট
দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার নাম। ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য হ্রাস করা এবং মানুষের সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম’। এই হাদিস মানুষের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে।
তাই বাজেটে এমন কর্মসূচি থাকতে হবে, যা মানুষকে ভিক্ষুক নয়, উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর উপায় হতে পারে। বাজেটে এসব খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
গণশিক্ষা ও দরিদ্রদের অধিকার
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ দারিদ্র্যের কারণে এখনও বহু শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থাভাবে ঝরে পড়ে। ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে অর্থনৈতিক দুর্বলতা কোনো শিশুর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। বাজেটে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করা গেলে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হবে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। তাই শিক্ষা খাতে ব্যয়কে খরচ নয়, বরং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও দরিদ্র মানুষের অধিকার
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসা না পাওয়া আজও অনেক মানুষের বাস্তবতা। ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল’ (সুরা মায়িদা : ৩২)।
এই নীতির আলোকে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা অপরিহার্য। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুচিকিৎসা, দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা এবং আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে। যে বাজেট মানুষের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করে, সেটিই প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমুখী বাজেট।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুরুত্ব
সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা বয়স, অসুস্থতা, প্রতিবন্ধকতা কিংবা অন্য কোনো কারণে নিয়মিত আয়ের সুযোগ পান না। এসব মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃদ্ধভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং অসহায় মানুষের জন্য বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মসূচি বাজেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
ইসলামের জাকাত ও বায়তুল মাল ব্যবস্থাও মূলত সমাজের দুর্বল মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল। তাই আধুনিক রাষ্ট্রেও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারমূলক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বৈষম্য হ্রাসে বাজেটের ভূমিকা
অতিরিক্ত বৈষম্য সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। ইসলাম সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়’ (সুরা হাশর : ৭)। এই আয়াত অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর একটি মৌলিক নীতি প্রদান করে। বাজেট প্রণয়নের সময় তাই এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ধনী আরও ধনী এবং গরিব আরও গরিব হয়ে না পড়ে। গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নমূলক প্রকল্প বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি বঞ্চিত মানুষের অধিকার হরণ করে
দুর্নীতি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু। একটি প্রকল্পে দুর্নীতি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। যে অর্থ হাসপাতাল, স্কুল বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় হওয়ার কথা, তা যদি দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়ে যায়, তা হলে প্রকৃত উপকারভোগীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ইসলাম দুর্নীতিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু আইনি অপরাধ নয়; এটি জনগণের হক নষ্ট করার শামিল। তাই বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
মোটকথা, বাজেট একটি রাষ্ট্রের আর্থিক পরিকল্পনা হলেও এর প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীর। এটি নির্ধারণ করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে কি না এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে কি না। মনে রাখতে হবে, ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের সম্পদে বঞ্চিত মানুষেরও নির্ধারিত অধিকার রয়েছে। তাই একটি আদর্শ বাজেট হবে এমন, যা দরিদ্র, এতিম, বিধবা, শ্রমিক, কৃষক, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে, বৈষম্য কমাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ করবে।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ
সময়ের আলো/এসএকে