আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কেনাকাটা। প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আমাদের নিয়মিত বাজারে যেতে হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই পার্থিব ব্যস্ততার মাঝে আমরা অধিকাংশ সময়ই মহান আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে পড়ি। অথচ মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো সর্বাবস্থায়, এমনকি বাজারের মতো কোলাহলপূর্ণ স্থানেও নিজেকে ইবাদতের আবহে রাখা। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসার পরিধি থেকে শুরু করে কেনাকাটার আদব- সবকিছুরই দিকনির্দেশনা রয়েছে। একজন সচেতন মুমিন বাজারের উত্তাল পরিবেশেও নিজেকে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন রাখতে পারেন।
বাজারে প্রবেশের সময় দোয়া পড়া মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি বাজারে অবস্থানকালীন সময় বরকতময় করে তোলে এবং অহেতুক গাফিলতি থেকে রক্ষা করে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, বাজারে প্রবেশের সময় বিশেষ এই দোয়াটি পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা পাঠকারীর আমলনামায় এক হাজার নেকি লিখে দেন, এক হাজার গুনাহ মাফ করে দেন এবং জান্নাতে তার মর্যাদা এক হাজার গুণ বৃদ্ধি করেন।
দোয়াটি হলো : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ইউহয়ি ওয়া ইউমিতু ওয়া হুয়াল হাইয়ু লা ইয়ামুতু, বিয়াদিহিল খাইরু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪২৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৩৫)। এই দোয়াটি পাঠের মাধ্যমে বাজারের ব্যস্ত পরিবেশে আল্লাহকে স্মরণ করার অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়।
বাজারে কেবল কেনাকাটার জন্য যাওয়া নয়, বরং ইসলামের অনুপম শিক্ষা সালামের প্রসার ঘটানোর জন্যও এটি হতে পারে একটি চমৎকার স্থান। সালাম পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির প্রতীক। সাহাবায়ে কেরাম বাজারে গিয়ে কেবল সালামের প্রচলন করার মাধ্যমে সেখানে আল্লাহর রহমত বর্ষণের পরিবেশ তৈরি করতেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর জীবন থেকে আমরা এমন এক শিক্ষণীয় ঘটনার কথা জানতে পারি, যেখানে তিনি শুধু সালাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়মিত বাজারে যেতেন। তিনি বাজারের প্রত্যেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মিসকিন ও পথচারীকে সালাম দিতেন, যদিও তখন তার নিজের কোনো কেনাকাটার প্রয়োজন থাকত না (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২১২৫)।
বর্তমান সময়ে যেখানে বাজারে মানুষ স্বার্থের পেছনে ছুটছে, সেখানে সালামের মাধ্যমে হৃদ্যতা ও পরোপকারের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব।
বাজারের কেনাবেচার ব্যস্ততা যেন কখনো আমাদের ফরজ ইবাদত বা নামাজের অন্তরায় না হয়। বিক্রেতা হোক কিংবা ক্রেতা, আজানের ধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব লেনদেন সাময়িক স্থগিত রেখে নিকটস্থ মসজিদে নামাজ আদায় করা ঈমানের দাবি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এমন ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করেছেন, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়েম করা থেকে বা জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখতে পারে না (সুরা নুর, আয়াত : ৩৭)।
তাই দুনিয়ার প্রয়োজনে বাজারে গেলেও আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের দিকে খেয়াল রাখা প্রতিটি মুমিনের একান্ত কর্তব্য। আসুন আমরা বাজারকে শুধু কেনাকাটার স্থান হিসেবে না দেখে, সেখানেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলি।
সময়ের আলো/এসএকে