আল্লাহ তায়ালার কুদরত অসীম ও অপার। তাঁর জ্ঞান, ইলম ও প্রজ্ঞা অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত এবং ইলম অর্জনের মাধ্যম ও ক্ষেত্রগুলোও বহুমুখী। কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতার গণ্ডিতে আল্লাহ তায়ালার অসীম শান ও মানকে আবদ্ধ করা যায় না।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের নানা উপায়ে উভয় জাহানের কল্যাণ ও উপকারে আসে এমন জ্ঞান ও ইলম দান করে থাকেন। অলি-আওলিয়া ও কামেল বান্দাগণ আজীবন সাধনা ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করে তাঁর পক্ষ থেকে বিশেষ তরিকা বা পথ লাভ করেন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ থেকে তারা ইনসানে কামেল বা পূর্ণাঙ্গ মানুষের মানে উন্নীত হন। মানবসমাজে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া এবং মুজাদ্দেদিয়া- এই চারটি তরিকা সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও প্রচলিত থাকলেও এর বাইরেও আরও বহু তরিকা রয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যারা আমাকে পাওয়ার পথে প্রচেষ্টা করে, আমি অবশ্যই তাদের জন্য আমার পথগুলোর (তরিকাগুলোর) সন্ধান দিয়ে দেব এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ নেককারদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)।
তাজকিয়া-ই-নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধতা অর্জনের উদ্দেশ্যে একজন হক্কানি বুজুর্গ বা কামেল ব্যক্তির হাতে বায়াত গ্রহণ করে কোনো সঠিক তরিকা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতি বা ধারা বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র যুগ থেকে শুরু হয়ে আজ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুল! যারা আপনার কাছে বায়াত গ্রহণ করছে, তারা তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহণ করছে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত। এরপর যে অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, তার ভঙ্গের পরিণাম তারই ওপর বর্তাবে। আর যে আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, তিনি তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।’ (সুরা ফাতাহ, আয়াত : ১০)।
তরিকা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো : পথ, পদ্ধতি, মাধ্যম বা উপায় ইত্যাদি। কোনো বুজুর্গ ব্যক্তি বা কামেল ও সিদ্ধ মহাপুরুষের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও সান্নিধ্য থেকে আল্লাহ তায়ালাকে পাওয়ার পথে অনুসন্ধানী বান্দার বিভিন্ন অবস্থান ও আত্মিক স্তর (সবক) অতিক্রম করার বিশেষ প্রক্রিয়া বা শিক্ষাকেই তরিকা বলা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি একটি শরিয়ত ও স্পষ্ট পথ (মিনহাজ) নির্ধারণ করে দিয়েছি। আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত বানিয়ে দিতেন, কিন্তু তিনি যা দিয়েছেন সে বিষয়ে তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। কাজেই তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৪৮)।
মানুষের আত্মিক উন্নতির জন্য তরিকা গ্রহণ করা কেন জরুরি, তার পেছনে রয়েছে গভীর আত্মিক ও আধ্যাত্মিক কারণ। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কলব বা অন্তর থেকে শয়তানের সব ধরনের প্ররোচনা ও ওয়াসওয়াসা দূর করা, অন্তর থেকে কুপ্রবৃত্তি এবং যাবতীয় কুরিপুগুলো চিরতরে উপড়ে ফেলা, অন্তরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ইসমে জাতের জিকির সার্বক্ষণিক জারি রাখা, অবাধ্য নফসকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে এনে প্রকৃত আত্মশুদ্ধি অর্জন করা, অন্তরে যাবতীয় উত্তম গুণাবলি ও নৈতিক স্বভাব অর্জন করা এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ নিশ্চিত করে পরকালের চিরন্তন ও চূড়ান্ত সফলতা লাভ করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সফলতার মাপকাঠি জানিয়ে ইরশাদ করেছেন, ‘সেই সফলকাম হয়েছে যে নিজ আত্মাকে পবিত্র করেছে। সেই ব্যর্থ হয়েছে যে নিজ আত্মাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত : ৯-১০)।
তরিকা গ্রহণের অপরিসীম গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে যুগে যুগে পৃথিবী বিখ্যাত মাশায়েখ ও ওলামায়ে কেরাম ইলমে মারিফাতের অধিকারী হক্কানি বুজুর্গ বান্দাদের সন্ধান করেছেন। তাদের অমূল্য সান্নিধ্য ও সোহবত লাভ করে, নিজেদের নফসকে পরিশুদ্ধ করেছেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্ত মুক্তি অর্জনে সর্বাত্মক সচেষ্ট হয়েছেন। পবিত্র কুরআনে মানুষকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ! তুমি তোমার রবের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করবে।’ (সুরা আল-ইনশিকাক, আয়াত : ৬)।
একজন মুমিন যখন সঠিক তরিকা ও বুজুর্গদের বাতলে দেওয়া পথে জীবন পরিচালনা করেন, তখন তিনি বহুমুখী আত্মিক ও দুনিয়াবি উপকার লাভ করতে সক্ষম হন। শয়তানের প্ররোচনা ও ওয়াসওয়াসা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতে বিনয়, নম্রতা এবং পূর্ণ একাগ্রতা অর্জিত হয়। এ ছাড়া ‘কলবে সালিম’, ‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ ও ‘হাক্কুল ইয়াকিন’ বা দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নেয়। হাকিকি ইলম বা বাস্তবসম্মত জ্ঞান অর্জিত হয়ে সঠিক আকিদা ও আমল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করা যায় এবং আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর নুরানি দিদার ও সান্নিধ্য বা কুরবাত লাভ করা সহজ হয়। মহান আল্লাহ আমাদের কোনো হক্কানি বুজুর্গ বা কামেল বান্দার কাছে বায়াত হয়ে এবং তাদের কাছ থেকে রুহানি ফয়েজ লাভ করে ইলমে মারিফাত হাসিলের তওফিক দান করুন, যেন আমরা আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা এবং তাঁর হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুপ্রিয় উম্মত হিসেবে কবুল হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি।
সময়ের আলো/এসএকে