ইতিহাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মানবসভ্যতা আজ যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে অসংখ্য মহৎ মানুষের অবদান রয়েছে। কেউ জ্ঞান দিয়ে পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করেছেন, কেউ নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্র গড়েছেন, কেউ চিন্তার জগতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এমন একজন মহামানব পৃথিবীতে এসেছেন, যাঁর জীবন একই সঙ্গে ঈমানের শিক্ষা, নৈতিকতার আদর্শ, মানবতার সৌন্দর্য, ন্যায়বিচারের ভিত্তি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার বাস্তব দৃষ্টান্ত। তিনি হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
তাঁর জীবন শুধু মুসলমানের ধর্মীয় ইতিহাস নয়, এটি মানবতার জন্য এক অনন্ত আলোকবর্তিকা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)।
নবীজি (সা.)-এর আগমনের আগে আরব সমাজ ছিল জাহেলিয়াতের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। গোত্রীয় অহংকার, প্রতিশোধ, সুদ, মদ, জুলুম, নারীর অবমাননা এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা সমাজকে গ্রাস করেছিল। কাবাঘর ছিল, কিন্তু তাওহিদের নির্মল শিক্ষা আচ্ছন্ন হয়েছিল অসংখ্য মূর্তির নিচে। এমন একসময়ে আল্লাহ তায়ালা প্রেরণ করলেন তাঁর সর্বশেষ রাসুল (সা.)-কে, যাঁর প্রথম ও প্রধান আহ্বান ছিল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর বান্দা হওয়ার শিক্ষা দিলেন এবং মানুষের মর্যাদাকে বংশ, গোত্র ও সম্পদের ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন।
মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন নবুয়তের আগেই ছিল পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মক্কার মানুষ তাঁকে বলত আস-সাদিক ও আল-আমিন বা সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত। চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হলো ‘ইকরা’, অর্থাৎ পড়ুন। এর মধ্য দিয়ে শুরু হলো মানবজাতির জন্য শেষ নবুয়তি বার্তার এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু সত্যের পথে তাঁর যাত্রা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। মক্কার কাফেররা তাঁকে উপহাস করেছে, নির্যাতন করেছে এবং তায়েফে পাথর মেরে রক্তাক্ত করেছে। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও তাঁর অন্তরে প্রতিশোধের আগুন জ্বলেনি, বরং জ্বলেছে মানুষের হেদায়েতের আকাঙ্ক্ষা। এটাই নবী (সা.)-এর চরিত্রের মহত্ত্ব, তিনি মানুষের ভুলের বিচার করেছেন, কিন্তু মানুষের ভবিষ্যতের দরজাও বন্ধ করেননি।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর চরিত্র সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’ (সুরা আল-কলম : ৪)। আয়েশা (রা.)-কে যখন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিগ্যেস করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন’ (সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ কুরআনের শিক্ষা তাঁর জীবনে শুধু উচ্চারিত হয়নি, তা তাঁর আচরণে, কথায়, সিদ্ধান্তে ও সমাজজীবনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। হিজরত কেবল একটি শহর থেকে অন্য শহরে যাত্রা ছিল না, এটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের সূচনা। মদিনায় তিনি মুহাজির ও আনসারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন এবং মসজিদকে শিক্ষা ও সমাজ গঠনের কেন্দ্র করলেন।
রাসুল (সা.)-এর মহত্ত্ব শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় নয়, পারিবারিক জীবনেও সমানভাবে প্রকাশিত। তিনি ছিলেন উত্তম স্বামী, স্নেহশীল পিতা এবং দায়িত্বশীল প্রতিবেশী। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন (সহিহ বুখারি)। তিনি দুর্বল, এতিম, দরিদ্র, নারী ও শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে তিনি এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে, সাহাবিদের মনে হয়েছিল হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারীও করা হবে। মক্কা বিজয় তাঁর জীবনের ক্ষমাশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য প্রতিশোধে নয়, ক্ষমায় দেখিয়ে দিয়েছেন। বিদায় হজে আরাফাতের বিশাল সমাবেশে তিনি মানব মর্যাদা, জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতার কথা ঘোষণা করেন।
সময়ের আলো/এসএকে