মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কোনো ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যিনি একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক সাধক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, আপসহীন সমাজসংস্কারক এবং পরম দয়ালু মানবহিতৈষী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)। বিশ্বজগতের প্রতি আল্লাহর অসীম করুণার প্রতীক হিসেবে তিনি এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন, যখন মানবতা তার অস্তিত্বের চরম সংকটে নিমজ্জিত ছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণে অত্যন্ত আগ্রহী, মুমিনদের প্রতি তিনি করুণাময় ও দয়ালু।’ (সুরা আত-তওবা : ১২৮)
আইয়ামে জাহেলিয়াত : এক অন্ধকার অধ্যায়রাসুল (সা.)-এর আবির্ভাবের পূর্ববর্তী সময়টি ইতিহাসের পাতায় ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ হিসেবে চিহ্নিত। সমাজকাঠামো তখন কেবল ধর্মীয়ভাবেই নয়, নৈতিক ও মানবিক দিক থেকেও ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিল। মদ্যপান, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার ও রাহাজানি ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া ছিল সে সময়ের তথাকথিত অভিজাত সমাজের এক নিষ্ঠুর প্রথা। রক্তক্ষয়ী গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর বংশীয় দম্ভের কারণে মানবিক মর্যাদা ছিল ভূলুণ্ঠিত। সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে মানুষ পাথরের মূর্তির পূজা করত এবং পশুসুলভ আচরণের মধ্য দিয়ে নিজেদের সভ্যতাকে নিচে নামিয়ে নিয়েছিল। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে মক্কার ধূলিধূসরিত প্রান্তরে আগমন করলেন বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত।
আরও পড়ুন
নবুয়তপূর্ব দূরদর্শিতা ও হিলফুল ফুজুলনবুয়তের মহিমান্বিত দায়িত্ব পাওয়ার বহু আগে থেকেই মহানবী (সা.) ছিলেন শান্তিকামী ও সেবাপরায়ণ। মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন আরবের কুরাইশরা ক্রমাগত অস্থিরতা ও জুলুমের শিকার হচ্ছিল, তখন তিনি সমবয়সিদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ বা শান্তিসংঘ। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন সামাজিক সংগঠন, যার উদ্দেশ্য ছিল মজলুমকে সহায়তা করা এবং সমাজে শান্তি বজায় রাখা। এই সংঘ প্রতিষ্ঠাই প্রমাণ করে যে, ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তার অতন্দ্রপ্রহরী। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে যখন তিনি হেরা গুহায় নবুয়ত লাভ করলেন, তখন থেকে শুরু হলো এক নতুন মহাকাব্য।
আত্মিক শুদ্ধি ও তাওহিদের বিপ্লবরাসুল (সা.) গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন যে, বাহ্যিক সংস্কারের চেয়ে জরুরি হলো মানুষের মনের সংস্কার। তিনি সাহাবাদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘সাবধান! মানবদেহে একপিণ্ড মাংস আছে; তা যদি সুস্থ থাকে, তবে পুরো শরীর সুস্থ থাকে। আর তা যদি অসুস্থ হয়, পুরো শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। মনে রাখবে, সেটাই হলো মানুষের অন্তর’ (বুখারি)। এই আত্মার সার্জারি বা শুদ্ধি করতে তিনি মহৌষধ হিসেবে পেশ করলেন ‘কালেমা তাইয়্যিবাহ’- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। এটি ছিল পৌত্তলিকতার শেকল ভাঙার মূলমন্ত্র। মানুষকে তিনি শিখিয়ে দিলেন যে, মর্যাদা কোনো বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বে নয়, বরং তাকওয়া বা আল্লাহভীতিতেই নিহিত। সুরা হুজরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যা ঘোষণা করেছিলেন, রাসুল (সা.) তা হাতেকলমে করে দেখালেন : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি।’
সামাজিক অধিকার ও নৈতিকতার অনন্য মানদণ্ডইসলামি সমাজব্যবস্থায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে রাসুল (সা.) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে’ (বুখারি)। এটি কেবল একটি উপদেশের বাণী ছিল না, ছিল একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের ঘোষণা। মানুষ হত্যাকে তিনি মহাপাপ হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন এবং কুরআনের আয়াতের আলোকে কঠোর আইনি ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। নীতিনৈতিকতাকে তিনি দুই ভাগে বিভক্ত করে শিক্ষা দিয়েছিলেন- অর্জনীয় ও বর্জনীয়। বিনয়, ক্ষমা, উদারতা, সততা এবং ধৈর্য এই গুণাবলিকে তিনি সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এমনভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন যে, তারা মরুভূমির সাধারণ রাখাল থেকে বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ‘সোনার মানুষে’ পরিণত হয়েছিলেন। অপরদিকে গিবত, অহংকার, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতার মতো আত্মঘাতী বৈশিষ্ট্যগুলো তিনি সমাজ থেকে সমূলে উপড়ে ফেলেছিলেন।
সত্যের পথে সংগ্রাম ও বিজয়ইসলামের দাওয়াত যখন মক্কার মোড়লদের স্বার্থের ওপর আঘাত হানল, তখন শুরু হলো অকথ্য নির্যাতন। তবু মহানবী (সা.) অটল ছিলেন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। সেখানেও ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত অব্যাহত ছিল। বদর, ওহুদ, খন্দকের মতো যুদ্ধগুলোতে মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছেন কিন্তু কোনো যুদ্ধেই তিনি প্রতিশোধপরায়ণ ছিলেন না। মক্কা বিজয়ের পর যে মহানুভবতা ও ক্ষমার দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি কাফেরদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই।’
চিরন্তন পথের দিশারাসুল (সা.) শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন কেয়ামত পর্যন্ত আসা সব মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। তিনি বিদায় হজে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি- আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং আমার সুন্নাহ। যদি তোমরা এ দুটি বিষয়কে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখো, তবে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না’ (বুখারি)। ১৪০০ বছর আগে যে ইসলামের আলো তিনি প্রজ্বলিত করেছিলেন, আজও সেই আলোই মানবজাতির একমাত্র আশ্রয়স্থল। দুনিয়াবি অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতা থেকে মুক্তি পেতে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সুন্নাহর রঙে নিজেদের জীবনকে রঙিন করার এবং তাঁর আদর্শের আলোকে সমাজ বিনির্মাণের তৌফিক দান করুন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এএডি