পৃথিবীর সব মানুষ আল্লাহর সৃষ্ট। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে পরকালের পরীক্ষার জন্য এবং পার্থিব জীবন সচল রাখার জন্য মানুষের মধ্যে স্তরবিন্যাস করেছেন। একই সঙ্গে সমাজের উপরস্থ ও অধীনস্থ শ্রেণির মধ্যে সম্পর্ক ও আচার-ব্যবহার কেমন হবে, সে ব্যাপারেও ইসলাম দিয়েছে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও নির্দেশনা। বাসা-বাড়ি, দোকানপাট অথবা চাকরির স্থলে যারা কাজের সহযোগিতা করে থাকেন তাদের প্রতি সদয় আচরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
কারণ মানুষ হিসেবে সবাই সমান মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। মৌলিক অধিকার সবার সমান। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকারও সবার ক্ষেত্রে সমান। ব্যক্তি স্বাধীনতাও সবার ক্ষেত্রে সমান। মর্যাদার দিক দিয়ে ইসলামে ধনী-গরিব সবাই সমান। রাসুল (সা.) খাদেম, শ্রমিক ও কাজের লোকদের প্রতি সদাচরণ, তাদের প্রতি দয়া-মায়া ও ইনসাফ প্রদর্শনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আর এই কারণেই শিশু জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) নিজের পিতা-মাতা ও নিজের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী থেকে প্রিয় নবীকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
ভুলত্রুটি ক্ষমা করা
মানুষ হিসেবে কেউই ভুলমুক্ত নয়। মালিক যেমন ভুল করতে পারেন, তেমনি শ্রমিকের থেকেও প্রকাশ পেতে পারে অনেক ভুলত্রুটি। কখনো ভুল হয়ে গেলে আমাদের কর্তব্য ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার একজন কাজের ছেলে আছে, সে অন্যায় করে এবং আমাকে কষ্ট দেয়। আমরা কাজের লোকদের কতবার ক্ষমা করব? এ কথা শুনে তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই কথা জিজ্ঞাসা করল। এবারও রাসুল কোনো উত্তর দিলেন না।
লোকটি তৃতীয়বার প্রশ্ন করার পর নবীজি বললেন, তোমরা কাজের লোকদের প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা করবে (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৪৯)। রাসুল (সা.) প্রথম দুবার চুপ ছিলেন কেন? এ ব্যাপারে হাদিস বিশারদগণ বলেন, লোকটির এমন প্রশ্ন নবীজি অপছন্দ করছিলেন।
কেননা ক্ষমা করা একটি উত্তম গুণ; যখনই হোক আর যেভাবেই হোক। এখানে সংখ্যা নির্ধারণ করার প্রয়োজন কী! তবে উল্লেখিত হাদিসে সত্তরের সংখ্যা দ্বারা নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়, বরং বেশি থেকে বেশি ক্ষমা করা বোঝানো হয়েছে।
সাধ্যাতিরিক্ত কাজ না চাপানো : মানুষকে আল্লাহ নির্দিষ্ট সহ্যক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কেউই তার সাধ্যের অতিরিক্ত করতে সক্ষম নয়। তাই কাজের লোকদের ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, অধীনস্থদের জন্য অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করা মালিকের ওপর আবশ্যক এবং সাধ্যের বাইরে তার ওপর কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না (মুসলিম, হাদিস : ১৬৬২)।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, সব উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, কাজের লোককে তার সামর্থ্যরে বাইরে কোনো কাজের আদেশ করা বৈধ নয়। যদি এমন কাজ দেওয়া হয়, তা হলে নিজে বা অন্যের মাধ্যমে তাকে সহযোগিতা করতে হবে।
একসঙ্গে পানাহার করা : রাসুল (সা.) খাদেম ও কাজের লোকদের সঙ্গে বসে পানাহার করতে কখনো সংকোচ বোধ করতেন না। বরং উম্মতে মুসলিমাকে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, যখন খাদেম খাবার প্রস্তুত করে তোমার সামনে পেশ করে, তখন (পারলে তাকে তোমার সঙ্গে বসিয়ে খাওয়াও) তাকে যদি তোমার সঙ্গে বসিয়ে খাওয়াতে না পারো অন্তত তার হাতে এক দুই লোকমা তুলে দাও। কারণ এ খাবার প্রস্তুত করতে গিয়ে (আগুনের তাপ) সব কষ্ট তো সেই সহ্য করেছে (বুখারি, হাদিস : ২৫৫৭)।
অথচ অনেক সময় আমাদের সমাজের আচরণ হয় খুবই দুঃখজনক। মালিকদের খাবারের অবশিষ্টাংশ এদেরকে খেতে দেওয়া হয় বা বাজার থেকে সরবরাহকৃত উন্নত মানের খাবার পরিবেশিত হয় মালিকপক্ষের টেবিলে আর বেচারি কাজের মেয়ের জন্য বরাদ্দ থাকে অনুন্নত দায়সারা গোছের কিছুর ব্যবস্থা।
প্রহার না করে বুঝিয়ে বলা : কাজের লোক বা গৃহকর্মী নির্যাতন একটি নির্মম সত্য বিষয়। কাজের মেয়েকে বেত্রাঘাত, গরম খুন্তির ছেঁকা, গরম পানি ঢেলে দিয়ে গা ঝলসে দেওয়ার ঘটনাও অহরহ প্রকাশিত হয় আজকাল। অথচ এমন কাজ আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধর্মের দৃষ্টিতেও মহা অন্যায়ের কাজ।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন, ‘আমি মদিনায় ১০ বছর রাসুল (সা.)-এর খেদমত করেছি। আমি ছিলাম অল্পবয়স্ক বালক। আমার সব কাজ রাসুলের মর্জিমাফিক হতো না। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় তিনি কখনো আমাকে ধমক দেননি এবং বলেননি যে, এটি কেন করেছ বা এটি কেন করোনি?’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৭৪)।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) কখনো তাঁর খাদেমকে প্রহার করেনি। তাঁর কোনো স্ত্রীকেও কখনো প্রহার করেননি। বরং সমগ্র জীবনে তিনি একবারের জন্যও নিজ হাতে কাউকে প্রহার করেননি (মুসলিম, হাদিস : ২৩২৫)।
কাজের লোক ও গৃহকর্মীদের সঙ্গে আমাদের আচরণ যদি হয় রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের, তা হলে তাদের মুখে হাসি ফুটবেই। আর তখন এদের খুশিতে হেসে উঠবে আমাদের সমাজের চারপাশ।
সময়ের আলো/এসএকে