মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের অবসানে স্বাক্ষরিত নতুন শান্তি চুক্তি ওয়াশিংটনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক মার্কিন বিশ্লেষক, সাবেক কর্মকর্তা এবং রাজনীতিবিদ মনে করছেন, যুদ্ধ বন্ধ হলেও এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত পরাজয় এবং ইরানের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য।
ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথ তৈরি করবে।
কী ছিল যুদ্ধের পটভূমি?
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং তেহরানের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এমনকি এক পর্যায়ে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘ সংঘাতের পর যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত কোনো প্রধান লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে সমালোচকদের দাবি।
কেন এই চুক্তিকে ‘পরাজয়’ বলা হচ্ছে?
মার্কিন রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, যুদ্ধ শেষ করতে গিয়ে ওয়াশিংটন এমন সব ছাড় দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
চুক্তির আওতায়— ইরানের তেল রফতানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়া হবে, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের শত শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত পাওয়ার পথ খুলে যাবে এবং ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।
সমালোচকদের মতে, এসব সুবিধার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তেমন কোনো বড় অর্জন নিশ্চিত করতে পারেনি।
যুদ্ধে কীভাবে চাপের মুখে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র?
যুদ্ধ চলাকালে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে হামলা না চালালেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকট তৈরি করে। তেলের দাম বাড়তে থাকে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন সংকটের আশঙ্কায় পড়ে।
এছাড়া ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, যা সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে।
ইরানের সবচেয়ে বড় লাভ কী?
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বিজয়ী হলো ইরান।
কারণ— দেশটির সরকার ক্ষমতায় টিকে গেছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরায় কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের ভাষায়, যুদ্ধের শেষে ইরান শুধু টিকেই থাকেনি, বরং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন
যুদ্ধের শুরুতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর এসব দেশ ধীরে ধীরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটতে শুরু করে।
কারণ তারা বুঝতে পারে, অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া বিকল্প নেই।
যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই হেরে গেছে?
সব বিশ্লেষক অবশ্য একমত নন। সাবেক মার্কিন কূটনীতিকদের একটি অংশ মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর হলেও তা আমেরিকার সামগ্রিক শক্তি বা মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবকে ধ্বংস করে দেয়নি।
তাদের মতে, সংকটের পুরো সময়ে রাশিয়া, চীন কিংবা ইউরোপ বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ছিল প্রধান আলোচনাকারী শক্তি।
তাই তারা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু কৌশলগত ছাড় দিলেও মধ্যপ্রাচ্যে এখনও সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবেই রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের এই শান্তি চুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটালেও এর রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থামছে না। এক পক্ষের মতে, এটি ইরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যর্থতার স্বীকৃতি। অন্য পক্ষের মতে, যুদ্ধ বন্ধ করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত— এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে এবং এর প্রভাব আগামী বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনুভূত হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ