পৃথিবীতে মানুষের জীবনের পথচলা শুরু হয় বাবা-মায়ের হাত ধরে। জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের অস্তিত্বের মূলে রয়েছে তাদের অসামান্য ত্যাগ, মমতা আর আশীর্বাদ। ইসলামি শরিয়তে সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন আদর্শ বাবা-মা কেবল সন্তানের ভরণপোষণ বা পার্থিব উন্নতির কথা ভাবেন না বরং তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়। সন্তানের জীবনের প্রতিটি সফলতার পেছনে বাবা-মায়ের নিরন্তর দোয়া এক অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় সন্তানকে শাসন করতে গিয়ে বাবা-মা রাগের মাথায় বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কিছু শব্দ উচ্চারণ করে বসেন, যা সন্তানের জন্য অভিশাপে রূপ নেয়। মা-বাবা হিসেবে তারা হয়তো জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না কিন্তু রাগের মাথায় করা ওই অভিশাপ সন্তানের ভবিষ্যতের ওপর যে কালো ছায়া ফেলে, তা হয়তো তারা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেন না। তখন যখন সময় গড়িয়ে যায় এবং সন্তানের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তখন চরম আফসোস ও আক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
এ বিষয়ে হাদিসে অত্যন্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। হজরত জাবের ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সফরে থাকা অবস্থায় জনৈক সাহাবি তাঁর উটকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাসুল (সা.) তাঁকে উট থেকে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, তোমাদের সন্তান-সন্তুতির বিরুদ্ধে এবং তোমাদের সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না। তোমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন বিশেষ মুহূর্তের জ্ঞানপ্রাপ্ত নও, যখন দোয়া করলে তিনি তা কবুল করে নেন’ (সহিহ মুসলিম : ৭৭৫৮)।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মোল্লা আলি কারী (রহ.) বিশ্লেষণ করেছেন যে, মানুষ জানে না কোন সময় দোয়া কবুল হয়, তাই রাগের মাথায় সন্তানের বিরুদ্ধে করা বদদোয়াও কবুল হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। (মিরআতুল মাফাতিহ : ৭/৭০৩)
নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে অভিশাপ দেওয়া মানে প্রকারান্তরে নিজেকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না’ (সুরা বাকারা : ১৯৫)। ইসলাম কখনোই মানুষের বা পরিবারের কোনো সদস্যের ক্ষতির প্রত্যাশা সমর্থন করে না। বাবা-মায়ের ওপর অর্পিত মহান দায়িত্ব হলো, সন্তানের যেকোনো ভুলত্রুটি শুধরে দেওয়ার সময় নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। সন্তানের মঙ্গলের জন্য শাসন অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু তা যেন কখনোই অভিশাপ বা বদদোয়ার রূপ না নেয়।
সন্তানকে শাসন করার সময় বাবা-মায়ের জবান অত্যন্ত সংযত থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, বাবা-মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য কোনো পর্দা ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া সরাসরি কবুল হয়- অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া’ (সুনানে তিরমিজি : ১৯০৫)।
তাই বাবা-মায়ের মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য সন্তানের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক। সন্তানের সাফল্য ও সুন্দর ভবিষ্যতের চাবিকাঠি বাবা-মায়ের নেক দোয়ার মধ্যেই নিহিত। রাগের মাথায় অভিশাপ না দিয়ে, সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ বজায় রেখে এবং ধৈর্যের সঙ্গে শাসন করার মাধ্যমেই একটি সুন্দর প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য রাগের মুহূর্তেও দোয়া করি, যেন আল্লাহ তাদের হেদায়েত ও সফলতার পথে পরিচালিত করেন।
সময়ের আলো/আআ