সামাজিক জীবনকে সুন্দর, শান্তিময় ও সৌহার্দপূর্ণ রাখতে হলে পারস্পরিক সম্মান এবং সুসম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমান সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, কিছু মানুষ অন্যকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, উপহাস, তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়। এ ধরনের আচরণ কোনো ভালো মানুষের কাজ হতে পারে না; বরং এগুলো জালেম ও পাপিষ্ঠদের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে মুমিনদের একে অন্যকে নিয়ে উপহাস করতে নিষেধ করেছেন।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অন্য কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো মহিলা অন্য কোনো মহিলাকেও যেন উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডাকো না; ঈমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা এ ধরনের আচরণ হতে নিবৃত্ত হয় না তারাই জালেম।’ (সুরা হুজরাত, আয়াত : ১১)
ভালো মানুষ কিংবা মুমিন ব্যক্তি কখনোই কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয় না। অথচ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানা অজুহাতে ঝগড়া-বিবাদের চিত্র চোখে পড়ে। ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও বাসের হেলপারের মধ্যে বাকবিতণ্ডা, পণ্য কেনাবেচার সময় ক্রেতা-বিক্রেতার দ্বন্দ্ব কিংবা চায়ের দোকানে রাজনীতি ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে তুচ্ছ কারণে হট্টগোল সৃষ্টি হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। অনেক সময় এসব ছোটখাটো বিষয় থেকে হাতাহাতি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। যারা বিনা কারণে অতিরিক্ত ঝগড়া করে, তাদের ইসলাম অত্যন্ত অপছন্দ করে।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সেই লোক সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে’ (বুখারি, হাদিস নং ২৪৫৭)। ঝগড়াটে স্বভাবের মানুষ কখনো প্রকৃত মুসলমানের আদর্শ ধারণ করতে পারে না।
গ্রামবাংলার গ্রামীণ জীবন কিংবা পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারীদের মধ্যেও অনেক সময় সামান্য বিষয় বা জমিজমা নিয়ে তুচ্ছ কারণে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ঝগড়া হতে দেখা যায়। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সন্দেহ, ব্যক্তিগত আক্রোশ, মিথ্যা প্ররোচনা কিংবা সম্পদ ও শক্তির অহংকার থেকে বড় বড় পারিবারিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় সামান্য বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া এসব ঝগড়া আদালত পর্যন্ত গড়ায়, যার ফলে আজীবন মামলা-মোকদ্দমা এবং জেল-জুলুমের শিকার হয়ে মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
ঝগড়া করার সময় অনেকেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেন এবং মুখে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘চারটি দোষ যার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে সে খাঁটি মুনাফিক; আর যার মধ্যে এ দোষগুলোর একটি বর্তমান রয়েছে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, সে চুক্তি করলে তা ভঙ্গ করে, সে ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং সে ঝগড়া করলে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে।’ (মুসলিম, হাদিস নং ১১৩)
ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতার কারণে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সুসম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ ইসলাম আমাদের শান্তি ও সমঝোতার শিক্ষা দেয়। যেখানেই ঝগড়া-বিবাদ বা ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়, সেখানে আমাদের দায়িত্ব হলো তা থামিয়ে দেওয়া এবং বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও’ (সুরা হুজরাত, আয়াত : ১০)। ঝগড়া ও অহংকার পরিহারকারীদের জন্য রয়েছে পরকালের মহা পুরস্কার।
হজরত আবু উমামাহ (রা.) বলেন, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার এবং যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার’ (আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮০০)।
পরিশেষে বলা যায়, হাসি-ঠাট্টা, উপহাস, তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং ঝগড়া-বিবাদ মানবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই আসুন, মহান আল্লাহকে ভয় করে সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ, হাসি-ঠাট্টা ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে নিজেদের দূরে রাখি। একটি শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দপূর্ণ এবং সুন্দর সমাজ গঠনে একে অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই।
লেখক : আলেম ও গবেষক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি