হাদিসের আলোকে জীবনের পথরেখা

মুফতি আবুল কাসেম নোমানী, ভারত

ইসলাম

মানুষের জীবনকে সুন্দর, শান্তিময় ও সফল করতে যুগে যুগে অসংখ্য দর্শন, তত্ত্ব ও পুস্তক রচিত হয়েছে। আত্মশুদ্ধি, সুখ ও প্রশান্তির

2026-08-09T10:24:44+00:00
2026-08-09T10:24:44+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
হাদিসের আলোকে জীবনের পথরেখা
মুফতি আবুল কাসেম নোমানী, ভারত
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের জীবনকে সুন্দর, শান্তিময় ও সফল করতে যুগে যুগে অসংখ্য দর্শন, তত্ত্ব ও পুস্তক রচিত হয়েছে। আত্মশুদ্ধি, সুখ ও প্রশান্তির সন্ধানে মানুষ নিরন্তর পথ খুঁজেছে। অথচ প্রায় দেড় হাজার বছর আগে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন কিছু সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাণী রেখে গেছেন, যার প্রতিটি শব্দ মানুষের ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ ও আত্মার জন্য একেকটি আলোকবর্তিকা। মাত্র পাঁচটি শিক্ষা, কিন্তু এর মধ্যে নিহিত রয়েছে একটি পরিশুদ্ধ জীবন গড়ার অনুপম দর্শন। হারাম থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকা, প্রতিবেশীর হক আদায় করা, অন্যের জন্য নিজের মতো কল্যাণ কামনা করা এবং অনর্থক অতিরিক্ত হাসি-তামাশা থেকে অন্তরকে রক্ষা করা- এই পাঁচটি শিক্ষা মানুষকে শুধু ভালো মানুষ নয়, বরং পরিপূর্ণ মুমিন ও আদর্শ মুসলমান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কে আছে, যে আমার কাছ থেকে এই কথাগুলো গ্রহণ করবে, অতঃপর এগুলোর ওপর আমল করবে অথবা যে এগুলোর ওপর আমল করবে তাকে শিক্ষা দেবে?’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমি, হে আল্লাহর রাসুল!’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাত ধরে পাঁচটি বিষয় গণনা করে বললেন, ‘হারাম বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ইবাদতগুজার হবে। আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকো, তা হলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ধনী হবে। তোমার প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করো, তা হলে তুমি মুমিন হবে। মানুষের জন্য তা-ই পছন্দ করো যা নিজের জন্য পছন্দ করো, তা হলে তুমি মুসলিম হবে। আর অধিক হাসবে না, কেননা অধিক হাসি অন্তরকে মৃত করে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৫)

হাদিসের শুরুতেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশ্নের মধ্যে আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। দ্বীনি জ্ঞান শুধু শোনার বিষয় নয়; বরং তা গ্রহণ করা, হৃদয়ে ধারণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করাই মূল উদ্দেশ্য। 

যে হৃদয় সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়, তার সামনে হাজারো নসিহত উচ্চারিত হলেও তার জীবন বদলাবে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। তাই নবীজি (সা.)-এর আহ্বান শোনামাত্রই তিনি প্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘আমি, হে আল্লাহর রাসুল!’

প্রথম শিক্ষা : হারাম থেকে বেঁচে থাকুন, ইবাদতের দরজা খুলে যাবে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য যেমন হালাল নির্ধারণ করেছেন, তেমনি হারামও নির্ধারণ করেছেন। একজন মুমিনের সৌন্দর্য শুধু নফল নামাজ, তসবিহ কিংবা দীর্ঘ সময়ের ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সে কোন কোন কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখছে, তার মধ্যেও প্রকৃত তাকওয়ার প্রকাশ ঘটে। 

হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা, হারাম লেনদেন থেকে দূরে থাকা, হারাম খাদ্য থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং চোখ, কান, জবান ও হাতকে হারাম থেকে হেফাজত করা সবই তাকওয়ার অংশ। কোনো ভালো কাজ করা অনেক সময় সহজ, কিন্তু প্রবল আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও কোনো হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা কঠিন। প্রবৃত্তি যেখানে টানছে, সেখানে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে থামিয়ে দেওয়াই প্রকৃত মুজাহাদা। 

তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) হারাম থেকে বেঁচে থাকাকে সর্বোচ্চ ইবাদতগুজার হওয়ার পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে হারামমুক্ত করতে পারে, তার জন্য নেক আমলের পথও সহজ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় শিক্ষা : কানাআত অন্তরের সেই সম্পদ, যার কোনো বাজারমূল্য নেই। মানুষের চিরন্তন অস্থিরতার এক অনুপম চিকিৎসা হলো কানাআত, আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকা। নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহ মানুষের জন্য যে রিজিক বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকলে সে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ধনী হয়ে যাবে। মানুষের দারিদ্র্য সবসময় পকেটে থাকে না, অনেক সময় দারিদ্র্য বাস করে অন্তরে। যার ঘরে অনেক কিছু আছে, কিন্তু অন্তরে তৃপ্তি নেই, সে প্রকৃত অর্থে দরিদ্র। আর যার সম্পদ সীমিত, কিন্তু আল্লাহর বণ্টনে তার হৃদয় প্রশান্ত, সে-ই প্রকৃত ধনী। 

দুনিয়ার সম্পদ যত বাড়ে, মানুষের চাহিদাও অনেক সময় তত বাড়তে থাকে। একটি চাহিদা পূরণ হলে আরেকটি নতুন চাহিদা সামনে আসে। এভাবে সম্পদের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ কখনো কখনো শান্তিকেই হারিয়ে ফেলে। কানাআত মানুষকে শেখায়, আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তার মধ্যে আমার জন্য কল্যাণ রয়েছে। সম্পদ অর্জনের চেষ্টা থাকবে, কিন্তু সম্পদের দাসত্ব থাকবে না। প্রয়োজন থাকবে, কিন্তু অতি লোভ থাকবে না। চেষ্টা থাকবে, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তরের অভিযোগ থাকবে না।

তৃতীয় শিক্ষা : প্রতিবেশী নিরাপদ না হলে ঈমানের সৌন্দর্য কোথায়? হাদিসের তৃতীয় শিক্ষা প্রতিবেশীর হক নিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করো, তা হলে তুমি মুমিন হবে।’ ঈমান শুধু মসজিদের ভেতরের বিষয় নয়। ঈমানের আলো মানুষের ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশীর দরজায় পৌঁছাবে, এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। পাশের বাড়ির মানুষটি আপনার ধর্মের হতে পারেন, আবার ভিন্ন ধর্মেরও হতে পারেন। কিন্তু তার অধিকার আছে, তার নিরাপত্তা আছে, তার সম্মান আছে। আপনার কথা, আচরণ, শব্দ কিংবা কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে সে যেন কষ্ট না পায়, এটাই একজন মুমিনের চরিত্র। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন, ‘আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ তিনবার উচ্চারিত এই সতর্কবাণী আমাদের আত্মসমালোচনার জন্য যথেষ্ট। আমরা কত নামাজ পড়ি, কত তসবিহ পড়ি তার পাশাপাশি এটিও ভেবে দেখা দরকার প্রতিবেশীরা কি আমাদের কাছ থেকে নিরাপদ?

চতুর্থ শিক্ষা : নিজের হৃদয়ের আয়নায় অন্য মানুষকে দেখুন। হাদিসের চতুর্থ শিক্ষা মানবিকতার এক সর্বজনীন ঘোষণা, ‘মানুষের জন্য তা-ই পছন্দ করো, যা নিজের জন্য পছন্দ করো।’ একজন পরিপূর্ণ মুসলমানের হৃদয় শুধু নিজের জন্য স্পন্দিত হয় না। অন্যের সুখেও সে আনন্দিত হয়, অন্যের দুঃখে ব্যথিত হয়। আমি নিজের জন্য সম্মান চাই, তা হলে অন্যকেও সম্মান দেব। নিজের জন্য স্বস্তি চাই, তা হলে অন্যকেও স্বস্তি দেব। 

নিজের জন্য ভালো ব্যবহার চাই, তা হলে অন্যের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করব। আমি চাই না কেউ আমাকে অপমান করুক, তা হলে আমিও কাউকে অপমান করব না। নিজের সুবিধা-অসুবিধার মতো করে অন্যের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করাই ইসলামের মানবিক সৌন্দর্য। আজকের সমাজে মানুষের অন্যতম বড় সংকট হলো আমরা নিজেদের অধিকারের কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলি, কিন্তু অন্যের অধিকারের কথা খুব সহজেই ভুলে যাই। এই হাদিস আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে দিয়ে অন্যের অনুভূতিকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শেখায়।

পঞ্চম শিক্ষা : অট্টহাসির আড়ালে যেন হৃদয়ের মৃত্যু না ঘটে। হাদিসের শেষ শিক্ষা অতিরিক্ত হাসি থেকে বেঁচে থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অধিক হাসি অন্তরকে মৃত করে দেয়।’ ইসলাম আনন্দের বিরুদ্ধে নয়; বরং ইসলাম মানুষকে পরিমিত ও শালীন আনন্দের শিক্ষা দেয়। মুচকি হাসি ও স্বাভাবিক হাসির দৃষ্টান্ত নবীজি (সা.)-এর জীবনেও পাওয়া যায়। কিন্তু অট্টহাসি, অনর্থক রসিকতা, অবিরাম গল্প-গুজব ও হাসি-তামাশায় জীবনকে ডুবিয়ে দেওয়া একজন মুমিনের জন্য শোভন নয়। অতিরিক্ত হাসি শুধু সময় নষ্ট করে না, ধীরে ধীরে অন্তরের সংবেদনশীলতাও কমিয়ে দিতে পারে। 

যে হৃদয় সবসময় হাসি-তামাশায় ডুবে থাকে, তার পক্ষে আখেরাতের চিন্তায় কাঁদা, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর সামনে বিনয়ী হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মুমিনের জীবন হবে ভারসাম্যের জীবন। আনন্দ থাকবে, কিন্তু বেহুদাপনা থাকবে না। হাসি থাকবে, কিন্তু অট্টহাসি নয়। কথা থাকবে, কিন্তু অনর্থক কথা নয়। অবসর থাকবে, কিন্তু আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।

পাঁচটি বাণী একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই পাঁচটি শিক্ষা মানুষের জীবনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেয়। হারাম থেকে বেঁচে থাকা মানুষকে তাকওয়া শেখায়। কানাআত মানুষকে অন্তরের ধনাঢ্যতা শেখায়। প্রতিবেশীর হক আদায় মানুষকে ঈমানের সামাজিক সৌন্দর্য শেখায়। অন্যের জন্য নিজের মতো কল্যাণ কামনা মানুষকে মানবিকতা শেখায়। আর অতিরিক্ত হাসি থেকে বিরত থাকা মানুষকে অন্তরের জীবন রক্ষা করতে শেখায়। 

একজন মানুষের বাহ্যিক জীবন কতটা সফল তা শুধু তার বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা দিয়ে মাপা যায় না। তার প্রকৃত সফলতা প্রকাশ পায় অন্তরে, চরিত্রে, লেনদেনে, প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণে এবং নির্জনে আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে।  রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই পাঁচটি বাণী তাই কেবল একটি হাদিসের পাঁচটি বাক্য নয়, বরং এগুলো যেন একটি পরিশুদ্ধ জীবনের পাঁচটি স্তম্ভ। আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই জীবন্ত শিক্ষার কাছে।

(৭ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার বায়তুল মোকাররমে ভারতের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম, শাইখুল হাদিস ও মুফতি আবুল কাসেম নোমানী জুমার আগে হৃদয়স্পর্শী বয়ান করেন। অনুলিখন করেছেন মুফতি সাইফুল্লাহ আজহারী, পরিচালক, ইসলামী রিসার্চ সেন্টার, জামিয়া ইসলামিয়া ফারুক্বিয়া, ঢাকা উদ্যান, মুহাম্মদপুর, ঢাকা)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   হাদিস  আলোকে  জীবন  পথরেখা  ইসলাম 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: